‘বহুদূর বিদর্ভ নগরে’ অন্ধকারে
সাল ২০১৫। নারায়ণ ওগারে, নরেশ নেওয়ালে, সুরেশ মাসানে সহ
১২ জন চাষির আত্মহত্যার খবরে নড়েচড়ে বসল দেশ। তথ্য বলছে, ততদিনে মহারাষ্ট্রের
বিদর্ভের বিভিন্ন গ্রামে শেষ একবছরে আত্মহননকারী কৃষকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৭৪।
আমাদের চেনা-জানার সীমাকে প্রবল ভাবে ঝাঁকুনি দেওয়া এই তথ্য ক্রমে আরও ভয়ংকর রূপ
ধারণ করে। ২০শে মে, ২০১৪ থেকে ২৪শে মে, ২০১৫ – এই একবছর সময়কালে ১৩০৬জন কৃষক
আত্মহত্যা করেছেন এই দেশে। ভারতীয় মিডিয়া যখন বর্তমান ‘আচ্ছে দিন’ সরকারের একবছর
পূর্তি উপলক্ষে স্তাবকতায় মগ্ন তখন বিদর্ভ সহ এদেশের অজস্র চাষি সীমাহীন অন্ধকারে
আত্মহননে মগ্ন। এ লজ্জা কার?
‘বিদর্ভ’ নামটি শোনার সাথে সাথেই আমাদের চোখের সামনে
ভেসে ওঠে ফুটিফাটা রিক্ত, খরা কবলিত উশর মাঠ। আর তার থেকেও মলিন বৃদ্ধ কৃষক
দু’ফোটা জলের আশায় বসে আছেন। এই প্রতীকী ছবি মিডিয়ার সৌজন্যে সকলেই দেখেছেন। অথচ
যে খবরটা মিডিয়া বেমালুম চেপে গিয়েছে, তা হ’ল- ‘ফান অ্যান্ড ফুড ভিলেজ’ নামক
অভিজাতদের জলক্রীড়ার প্রমোদ কানন, যা বিদর্ভেই অবস্থিত। এখানে ১৯টিরও বেশী
জলক্রীড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। একদিকে অভিজাতদের প্রমোদের জন্য জলের অপচয় আর অন্যদিকে
খরার প্রকোপ। কীভাবে ক্রমাগত এইসব চাষিদের বেঁচে থাকার ন্যুনতম সামগ্রীর বিপ্রতীপে
নিদারুণ আমোদের ব্যবস্থা করা হয়েছে, কীভাবে ক্রমাগত ভুমিক্ষয়ের মত ক্ষয়ে যাচ্ছে দশ
হাজার বছরের চাষবাসের ইতিহাস,- ক্ষয়ের এই পরিকল্পিত প্রক্রিয়ার বৃত্তান্ত এখনও
মুলস্রোতের মিডিয়ায় জায়গা পায়নি।
তথ্য বলছে, ১৯৯৭
থেকে ২০০৫-এর মধ্যে এদেশে প্রত্যেক ৩২ মিনিটে একজন চাষি আত্মহত্যা করেছে। তবুও
আমরা চুপ ছিলাম। কেননা, সভ্য নাগরিক সমাজের বাইরে প্রান্তিক মানুষের জীবনবৃত্তান্ত
নিয়ে আমরা ভাবিত নই।
যে দেশে ৬৬% গ্রামীণ শ্রমিক কৃষিকাজের সাথে যুক্ত,
যেদেশে অধিকাংশ কৃষক তাঁর পারিবারিক কৃষির উপর নির্ভরশীল- সেখানে দিনের পর দিন
কর্পোরেট স্বার্থে কৃষিনীতি গ্রহণ করা হয়েছে। উচ্চফলনশীল তথা হাইব্রিড বীজ ধ্বংস
করেছে সহস্র বছর ধরে প্রকৃতির উদ্বর্তনে বেঁচে থাকা অজস্র দেশজ বীজকে। চাষের খরচ
যেমন বেড়েছে, তেমনই মুনাফার লোভ দেখিয়ে যথেচ্ছ ভাবে রাসায়নিক সারের ব্যবহার জমির প্রকৃতিকে
মৃত্যুর খুব কাছে নিয়ে এসেছে। এই চাষ ভিত্তিক কর্পোরেট রাজনীতি ও তার কার্যকরণ খুব
জটিল এবং সে বিষয়ে আলোচনা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই সব আত্মহত্যার প্রেক্ষাপট আলোচনা
করতে বসলে এসব বিষয়কে আলোচনার বাইরে রাখার একটা সুচিন্তিত প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়।
পরিশেষে যে বিষয় নিয়ে না বললেই নয়, তা হ’ল- যেসব চাষিরা
আত্মহত্যা করেছেন, তাঁরা সকলেই ঋণের জালে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। বিদর্ভের এই বিস্তীর্ণ
অঞ্চলে অধিকাংশ চাষিই তুলো চাষ করেন। বিটি কটন, যথেচ্ছভাবে রাসায়নিক সারের প্রয়োগ,
খরা প্রভৃতি তাঁদের চাষের খরচ বাড়িয়েছে। তেমনই চাষের খরচ চালানোর জন্য ঋণ নিয়ে
সর্বস্বান্ত কৃষকের কাছে ফসল নষ্ট হওয়া জীবন নষ্ট হওয়ার সামিল।
একটা তথ্য দেওয়া যাক। ১৯২৩ সালে ব্রিটিশ রয়্যাল কমিশন
তাঁদের রিপোর্টে জানিয়েছিল, “The Indian agriculturists are
born in debt, live in debt and die in debt, passing on their burden to those
who follow”.
এরপর ৯২ বছর পেরিয়ে গেল। আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছি। একই
সমস্যা এখনও রয়ে গিয়েছে। শুধু তার পরিধি আর প্রকরণ আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
তাহলে কীসের স্বাধীনতা? কীসের পরিবর্তন? কীসের ‘আচ্ছে
দিন’? কাদের ‘আচ্ছে দিন’?
‘প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা’
No comments:
Post a Comment