এভাবে একাকী
হাঁটা অথবা বেঁচে থাকার সুখ
দিনের প্রথম আলোর একটা মেদুরতা আছে। দুপুরের ক্লান্তি আর বিকেল জুড়ে নিঃসঙ্গতা ক্রমশ ভারি হয়ে আসে। আমরা ভুলে যাই একেকটা রোদেলা দিন। মাঝে মাঝে কে যেন জানান দেয়, পুণ্যতোয়া আলোর কথা- যে আলোয় ছায়া পড়ে না। আমরা খুঁজে বেড়াই সেই আলো। খুব কাছাকাছি পৌঁছানো যায়, কিন্তু ছোঁয়া যায় না। বিজ্ঞানের ভাষায়- ‘টেন্ডস টু জিরো’। এই ছোঁয়ার আকুতি আছে, তাই আমরা জেগে আছি। বারবার মনে হয় –‘বেঁচে থাকার কী আনন্দ!’
মাতসুও বাশো’র লেখা ‘ওকু হো হোসোমিচি’র ( The Narrow Road to the deep North) বঙ্গানুবাদ পড়ে এটাই মনে হ’ল। The Narrow Road to the deep North-এর বাংলা ‘ গভীর উত্তর সরণীতে’। অনুবাদক দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যকে কুর্নিশ। প্রথাগত বঙ্গানুবাদের বাইরে গভীর দার্শনিক উচ্চারণ হয়ে ওঠে ‘ গভীর উত্তর সরণীতে’। গ্রন্থের নামেই চমকে উঠেছিলাম। প্রজ্ঞার বোঝা নেই। অথচ বাংলা নামেই মূল গ্রন্থকে আইডেন্টিফাই করা যায়।
প্রসঙ্গত বলাবাহুল্য, জাপানের প্রবাদপ্রতিম ‘হাইকু’ কবি মাতসুও বাশো চিরন্তন চিন্তনের প্রতীক। জীবনের প্রতি গভীর প্রত্যয় থেকে স্থির বিশ্বাসে উপনীত হয়েছিলেন তিনিঃ সাহিত্য আমাদের অন্তরে স্থির প্রজ্ঞার জন্ম দেয় যা অজস্র অনুভূতি আর অভিজ্ঞতার সমাহার। এই অনুভূতি সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে তিনি বারবার ছুঁয়ে দেখেছেন আলো, আকাশ, মানুষ । এভাবেই ১৬৮৯ সালের মে মাসে তিনি বেড়িয়ে প্রেন জীবনকে স্পর্শ করার তীব্র আকুতিতে। প্রসঙ্গত মনে রাখা দরকার, এসময় বাশো প্রতিষ্ঠিত কবি। তবুও জীবনকে ছুঁয়ে দেখার তীব্র বাসনা নিয়ে তিনি হেঁটেছিলেন ১৫০০ মাইল পথ। এডো (এখন টোকিয়ো) থেকে অকু হেঁটেছিলেন ১৫৬ দিনে। কোনও তাড়া নেই তাঁর। চোখ মেলে দেখে নেওয়া। এভাবেই জন্ম নিয়েছিল জাপানী সাহিত্যের সর্বোত্তম পদ্য-ভাষ্য ‘ওকু হো হোসোমিচি’ ( The Narrow Road to the deep North) অথবা ‘ গভীর উত্তর সরণীতে’।
গ্রন্থের সূচনায় বিধৃত হয়েছে যাত্রা শুরুর আবাহনী- “ কিন্তু বসন্ত এল তার কুয়াশার স্পর্শঘেরা আকশটি সাথে নিয়ে। পথের দেবতা আবার ডাক দিলেন আমায়”। মেক্সাগুল্ম আগুনে পুড়িয়ে পায়ে মেখে নিলেন বাশো। নিজের ঘরদোর বেঁচে দিয়ে আশ্রয় নিলেন অতিথিশালায়। এরপর চূড়ান্ত রোমান্টিক কবি ঘরের খুঁটিতে লিখে দিলেন বিদায় সম্ভাষণ অথবা নতুন সভ্যতার ঊষালগ্নের মতো কোন ‘হাইকু’- “ সন্ন্যাসীর এই বিজন ঘর/ বদলে যাবে, জানতে পাবে/ হয়তো কারো পুতুল খেলার কথা”। যেভাবে আমাদের সমস্ত স্মৃতি বিষণ্ণ হেমন্তের নীরবতা বয়ে আনে, যেভাবে আমাদের হারিয়ে যাওয়া এ্যালবামের হলদেটে ঘ্রাণ ছখে-মুখে জড়ো হয়, সেভাবেই কবি কণ্ঠে ভেসে ওঠে বিদায়ের গুটিকয়েক শব্দমালা- “ বসন্ত চলে যায়/ বিদায়ের সুর বাজে/ পাখিদের গানে/ মাছেদের অশ্রুমাখা চোখে”।
এরপর বাশো হাঁটতে থাকেন। সোকা পার হয়ে পোঁছান মুরোনোয়াসিমাতে। এরপর নিক্কো। এভাবে তাঁর সাথে এগিয়ে চলে এই আলেখ্য। তবুও চলার বিরাম নেই। অজস্র শব্দের সীমাহীন কলেবর নেই। তবুও গোটা আকাশ ধরে রাখেন গোটা বই জুড়ে। এভাবেই সৃজিত হয়েছে অনুপম কিছু রূপকল্প- “ কিশোরীর ভিজে হাতে/ ধান বোনা শেষ হলে পরে/ গাছের ছায়াটি ছেড়ে আমি ফের পথে”। আবুকুমা নদী, আইজু পাহাড় – এসব নিয়ে কোন গভীর পর্যালোচনা নেই। তবু পড়তে পড়তে মনে হয়, এসব বড্ড চেনা। মাঝে মাঝে ভেসে ওঠে কিছু মন্দির আর তাদের ঘিরে জন্ম নেওয়া গল্পগাথার ছোট ছোট কোলাজ। ইসে মন্দিরের দিকে এগিয়ে চলেছেন বাশো। সব ক্লান্তি পথে ফেলে এসেছেন। আবার চলা। শুরুতেই বলেছিলাম, শূন্যয় পৌঁছানো যাবে না, তবে যতটা সম্ভব কাছে যাওয়া যায়। এভাবেই আরেকটি যাত্রার অভিমুখে এই বই শেষ হয়। বাকি থাকে শুধু বিদায় আর সূচনার মাঝে জড়ো হওয়া এক চিলতে রোদ। জীবনের প্রতিরূপ বোধহয়।
অমিতাভ ভট্টাচার্যের করা প্রচ্ছদ অনবদ্য। হারিয়ে যাওয়া নীলচে নোট বুকের উপর সাদা - কালো –লাল নামাঙ্কন। এই সাদামাটা রূপ ছড়িয়ে আছে সারা বইয়ের সমস্ত অক্ষরে, চেতনায়। এটাই এই বইয়ের যোগ্য ট্রিটমেন্ট। সর্বোপরি দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের অনুকরণযোগ্য বোধ আর দক্ষতা এই বইকে করে তুলেছে আক্ষরিক অর্থেই ‘আনপুট ডাউনেবল’।
প্রকাশককে ধন্যবাদ এই ধরণের ক্লাসিক গ্রন্থের অনুবাদ প্রকাশ করার জন্য।
তবে একটা অনুযোগ রয়ে গেল। বাশো’র জীবনী এবং এই গ্রন্থের প্রেক্ষাপট সম্বন্ধীয় একটা প্রস্তাবনা থাকা জরুরী।
গভীর উত্তর সরণীতে
মাতসুও বাশো
অনুবাদকঃ দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
প্রচ্ছদ ও অলংকরণঃ অমিতাভ ভট্টাচার্য
প্রকাশকঃ সৃষ্টিসুখ
মুল্যঃ ১২০ টাকা
দিনের প্রথম আলোর একটা মেদুরতা আছে। দুপুরের ক্লান্তি আর বিকেল জুড়ে নিঃসঙ্গতা ক্রমশ ভারি হয়ে আসে। আমরা ভুলে যাই একেকটা রোদেলা দিন। মাঝে মাঝে কে যেন জানান দেয়, পুণ্যতোয়া আলোর কথা- যে আলোয় ছায়া পড়ে না। আমরা খুঁজে বেড়াই সেই আলো। খুব কাছাকাছি পৌঁছানো যায়, কিন্তু ছোঁয়া যায় না। বিজ্ঞানের ভাষায়- ‘টেন্ডস টু জিরো’। এই ছোঁয়ার আকুতি আছে, তাই আমরা জেগে আছি। বারবার মনে হয় –‘বেঁচে থাকার কী আনন্দ!’
মাতসুও বাশো’র লেখা ‘ওকু হো হোসোমিচি’র ( The Narrow Road to the deep North) বঙ্গানুবাদ পড়ে এটাই মনে হ’ল। The Narrow Road to the deep North-এর বাংলা ‘ গভীর উত্তর সরণীতে’। অনুবাদক দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যকে কুর্নিশ। প্রথাগত বঙ্গানুবাদের বাইরে গভীর দার্শনিক উচ্চারণ হয়ে ওঠে ‘ গভীর উত্তর সরণীতে’। গ্রন্থের নামেই চমকে উঠেছিলাম। প্রজ্ঞার বোঝা নেই। অথচ বাংলা নামেই মূল গ্রন্থকে আইডেন্টিফাই করা যায়।
প্রসঙ্গত বলাবাহুল্য, জাপানের প্রবাদপ্রতিম ‘হাইকু’ কবি মাতসুও বাশো চিরন্তন চিন্তনের প্রতীক। জীবনের প্রতি গভীর প্রত্যয় থেকে স্থির বিশ্বাসে উপনীত হয়েছিলেন তিনিঃ সাহিত্য আমাদের অন্তরে স্থির প্রজ্ঞার জন্ম দেয় যা অজস্র অনুভূতি আর অভিজ্ঞতার সমাহার। এই অনুভূতি সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে তিনি বারবার ছুঁয়ে দেখেছেন আলো, আকাশ, মানুষ । এভাবেই ১৬৮৯ সালের মে মাসে তিনি বেড়িয়ে প্রেন জীবনকে স্পর্শ করার তীব্র আকুতিতে। প্রসঙ্গত মনে রাখা দরকার, এসময় বাশো প্রতিষ্ঠিত কবি। তবুও জীবনকে ছুঁয়ে দেখার তীব্র বাসনা নিয়ে তিনি হেঁটেছিলেন ১৫০০ মাইল পথ। এডো (এখন টোকিয়ো) থেকে অকু হেঁটেছিলেন ১৫৬ দিনে। কোনও তাড়া নেই তাঁর। চোখ মেলে দেখে নেওয়া। এভাবেই জন্ম নিয়েছিল জাপানী সাহিত্যের সর্বোত্তম পদ্য-ভাষ্য ‘ওকু হো হোসোমিচি’ ( The Narrow Road to the deep North) অথবা ‘ গভীর উত্তর সরণীতে’।
গ্রন্থের সূচনায় বিধৃত হয়েছে যাত্রা শুরুর আবাহনী- “ কিন্তু বসন্ত এল তার কুয়াশার স্পর্শঘেরা আকশটি সাথে নিয়ে। পথের দেবতা আবার ডাক দিলেন আমায়”। মেক্সাগুল্ম আগুনে পুড়িয়ে পায়ে মেখে নিলেন বাশো। নিজের ঘরদোর বেঁচে দিয়ে আশ্রয় নিলেন অতিথিশালায়। এরপর চূড়ান্ত রোমান্টিক কবি ঘরের খুঁটিতে লিখে দিলেন বিদায় সম্ভাষণ অথবা নতুন সভ্যতার ঊষালগ্নের মতো কোন ‘হাইকু’- “ সন্ন্যাসীর এই বিজন ঘর/ বদলে যাবে, জানতে পাবে/ হয়তো কারো পুতুল খেলার কথা”। যেভাবে আমাদের সমস্ত স্মৃতি বিষণ্ণ হেমন্তের নীরবতা বয়ে আনে, যেভাবে আমাদের হারিয়ে যাওয়া এ্যালবামের হলদেটে ঘ্রাণ ছখে-মুখে জড়ো হয়, সেভাবেই কবি কণ্ঠে ভেসে ওঠে বিদায়ের গুটিকয়েক শব্দমালা- “ বসন্ত চলে যায়/ বিদায়ের সুর বাজে/ পাখিদের গানে/ মাছেদের অশ্রুমাখা চোখে”।
এরপর বাশো হাঁটতে থাকেন। সোকা পার হয়ে পোঁছান মুরোনোয়াসিমাতে। এরপর নিক্কো। এভাবে তাঁর সাথে এগিয়ে চলে এই আলেখ্য। তবুও চলার বিরাম নেই। অজস্র শব্দের সীমাহীন কলেবর নেই। তবুও গোটা আকাশ ধরে রাখেন গোটা বই জুড়ে। এভাবেই সৃজিত হয়েছে অনুপম কিছু রূপকল্প- “ কিশোরীর ভিজে হাতে/ ধান বোনা শেষ হলে পরে/ গাছের ছায়াটি ছেড়ে আমি ফের পথে”। আবুকুমা নদী, আইজু পাহাড় – এসব নিয়ে কোন গভীর পর্যালোচনা নেই। তবু পড়তে পড়তে মনে হয়, এসব বড্ড চেনা। মাঝে মাঝে ভেসে ওঠে কিছু মন্দির আর তাদের ঘিরে জন্ম নেওয়া গল্পগাথার ছোট ছোট কোলাজ। ইসে মন্দিরের দিকে এগিয়ে চলেছেন বাশো। সব ক্লান্তি পথে ফেলে এসেছেন। আবার চলা। শুরুতেই বলেছিলাম, শূন্যয় পৌঁছানো যাবে না, তবে যতটা সম্ভব কাছে যাওয়া যায়। এভাবেই আরেকটি যাত্রার অভিমুখে এই বই শেষ হয়। বাকি থাকে শুধু বিদায় আর সূচনার মাঝে জড়ো হওয়া এক চিলতে রোদ। জীবনের প্রতিরূপ বোধহয়।
অমিতাভ ভট্টাচার্যের করা প্রচ্ছদ অনবদ্য। হারিয়ে যাওয়া নীলচে নোট বুকের উপর সাদা - কালো –লাল নামাঙ্কন। এই সাদামাটা রূপ ছড়িয়ে আছে সারা বইয়ের সমস্ত অক্ষরে, চেতনায়। এটাই এই বইয়ের যোগ্য ট্রিটমেন্ট। সর্বোপরি দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যের অনুকরণযোগ্য বোধ আর দক্ষতা এই বইকে করে তুলেছে আক্ষরিক অর্থেই ‘আনপুট ডাউনেবল’।
প্রকাশককে ধন্যবাদ এই ধরণের ক্লাসিক গ্রন্থের অনুবাদ প্রকাশ করার জন্য।
তবে একটা অনুযোগ রয়ে গেল। বাশো’র জীবনী এবং এই গ্রন্থের প্রেক্ষাপট সম্বন্ধীয় একটা প্রস্তাবনা থাকা জরুরী।
গভীর উত্তর সরণীতে
মাতসুও বাশো
অনুবাদকঃ দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
প্রচ্ছদ ও অলংকরণঃ অমিতাভ ভট্টাচার্য
প্রকাশকঃ সৃষ্টিসুখ
মুল্যঃ ১২০ টাকা

No comments:
Post a Comment