Content

Wednesday, October 15, 2014

অবশেষে যেটা সিনেমা হতে পারেনি, কিন্তু জন্ম দিয়েছে রূপকথার

...'' ভেতরে ভেতরে একটা গোঙরানি মাঝেমাঝেই জাগে, সেটাকে চেপেচুপে বসে থাকতে হয়, নয়তো সামাজিক হওয়া যায় না। তবুও আমি মোহগ্রস্থের মত উলটোপালটা করি''। অনেকটা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের গদ্যের মত-‘ ওই ব্যাপারটা আমাকে ফুসলে নিয়ে যে কোনদিকে ভেগে পড়ে। তছনছ করে দেয়। বৈরাগীর ছাই মাখাতে থাকে দুহাতে-চার হাতে। আমি ওই উড়নচণ্ডীপনার সাথে এঁটে উঠি না’।
এই উড়নচণ্ডীপনার অঙ্গ হিসেবেই রূপকথার জন্ম। কোন এক শীতের ভোর। আমি আর কৈলাস পুরুলিয়া এক্সপ্রেস ধরতে ভোর সাড়ে চারটায় রওনা দিয়েছি। পুরুলিয়া স্টেশনে যখন পৌঁছেছি... তখন সাদা কুয়াশা আর হিম ঝরা কাঁপন লেগে ছিল আমাদের পুলওভারে। আদ্রা জংশন থেকে একটা গাড়ি ভাড়া করে পৌঁছুলাম কাশীপুর। আগের রাতেই পূর্ণাভ দা সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল। DRCSC’র প্রশান্ত দা’কে ফোন করে জানা গেল... একটা বোলেরো পাঠাবে... কিন্তু কোথায় কি? গাড়ি এল অনেক পরে...
যখন আমরা ক্রোশঝুরি পৌঁছুলাম, তখন কুয়াশা কেটে গেছে। DRCSC’র সার্ভিস সেন্টারের নাম ‘ক্রোশঝুরি পলাশ’।এসময় নামকরণের সার্থকতা নির্ণয়ের মত সময় আমাদের হাতে ছিল না। মামুলকে সমস্ত বিষয়টা বোঝানোর পর ও ওর ‘কিশোর বাহিনী’কে রেফার করল। অতএব এবার গন্তব্য ‘দোলালাতা’ গ্রাম।
শাল মহুয়া ঘেরা ছবির মত সুন্দর সাঁওতালপল্লী এই দোলালাতা। অসহ্য বিমুঢ়তা সারা রাস্তা জুড়ে। লাল ধুলো উড়িয়ে গাড়ি ছুটে চলেছে... তার সাথে তাল মিলেয়ে ছুটছে এক দঙ্গল কচিকাঁচা। ক্যামেরা আর গাড়ি- ভিড় জমানোর পক্ষে যথেষ্ট। রেকি পর্ব সমাধা হতে হতে সাড়ে এগারোটা বাজল। তখনো আমরা অডিশন শুরু করতে পারিনি।এর উপর, মনমত একটা ছাগলের বাচ্চা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। বাবলু দা দায়িত্ব নিয়ে খুঁজে আনল সত্যিকারের তীর ধনুক।গোটা তিরিশেক বাচ্চার মধ্যে একজনকে বেশ মনে ধরল- শিবানী পরমাণিক।
কাজ শুরু করতে করতে বেলা সাড়ে বারোটা বেজে গেল। একটাই বাঁচোয়া -সমস্ত শট ডিভিশন ফ্রেম টু ফ্রেম আমি আগে থেকেই খাতায় ইলাস্ট্রেট করে রেখেছিলাম। কিন্তু ততক্ষণে বুঝে গেছি, এ কাজ শেষ হবে না।এর মাঝে টিফিন এল। আরও সময় নষ্ট। তবুও আজই সবটা নামাতে হবে। কেননা, ছবির মত সুন্দর চরাচর, কতগুলো বাচ্চার স্বপ্ন আর সিনেমা’র থেকে বড় কোন রোমান্স সেদিন ছিল না।
এক একটা শট নিতে হচ্ছিল কুড়ি-বাইশ বার। ছাগল ভেগে যায়... তাই মানব বন্ধনী বানানো হ’ল। এসবের পরও গল্পটা শেষ করতে পারলাম না। শেষ মোচড়টা বাদ গেল। বড্ড খারাপ লাগছিল। পরের দিন ছবি তোলা যেত, কিন্তু অফিস এত ছুটি দেবে কেন?
সন্ধ্যায় খেতে বসলাম। সারা গ্রামের লোক আমাদের সাহায্য করেছিল। পারিশ্রমিক দেবার সাধ্য নেই ... অতএব বনমুরগী জোগাড় করা হ’ল।
যেহেতু গল্পটা বদলে গেল... বলার অপেক্ষা রাখে না – সিনেমাটাও বদলে গেল। গল্পের শেষের সবটা হারিয়ে গেল। কিন্তু যেটা তৈরি হ’ল সেটা কি সিনেমা? আমার দেশ এখনো বিকল্প ভাবনার চলচ্চিত্রকে গ্রহণ করেনি। দুরন্ত স্টোরি টেলিংকে এখনো সিনেমার মান নির্ণায়ক ব্যারোমিটার বলে ধরে নেওয়া হয়। তাই ‘আর একটি রূপকথা’ কোন সিনেমা নয়। ছোট ছোট অনুভূতির মান্তাজ। অথচ আমার পুরনো চিত্রনাট্যে ‘সিনেমা’ হবার সব রসদ-ই ছিল। ছোট ছোট শট আর মান্তাজ মিলে যায় এখানে। কিন্তু কোন ডেফিনিট গল্প বলে না। ফলত দৈনন্দিন জীবনের একটা খাতা অথবা কয়েকটা পৃষ্ঠা তৈরি হয়।
কিন্তু এসবের পরেও রূপকথা তৈরি হয়েছে। শিবানী- সারা জীবনে ক্যামেরা দেখেনি। কোন ছবি নেই ওর ছেলেবেলার... তবুও যে মাপের অভিনয় ও করেছিল,সেটাকে স্বীকৃতি না জানিয়ে উপায় নেই... আর কোনদিন হয়ত কোন সিনেমায় ও আর অভিনয় করবে না। কিন্তু আমাকে আমার সিনেমা দর্শনের বাইরে একটা শিক্ষা দিয়ে গেল... প্রথাগত শিক্ষা জরুরী, কিন্তু প্রতিভা শুধু শহুরে বাবুদের ঘর আলো করে জন্মায় না। ওটা’র বীজ লুকিয়ে থাকে শেকড়ে।
কৈলাসকে যখন বলেছিলাম, কাজটা’র বারো বাজল। কৈলাস কোন উত্তর দেয় নি। সেদিন ২১ ইঞ্চির মনিটরে যখন শট সিলেকশন হচ্ছে, তখন মন জুড়ে শুধু দোলালতা, শিবানী আর আশ্চর্য সব স্মৃতিরা ভিড় করল-
শাল, ইউক্যালিপটাসের জঙ্গল, দিগন্ত বিস্তৃত লাল মাটির টাড়, শিবানী, কৈলাস, অজস্র বাচ্চা, সাঁওতাল পরিবার, বালিমাখা পোড়া সরাল, Panasonic AG-AC120 এ তুলে রাখা অপার্থিব সূর্যোদয়, একটা সিনেমা – সে এক তীব্র বনজ স্বাদ- গন্ধ যেন। এর সাথে কোথায় যেন মিশে যায় এই মহৎ শিল্পের প্রতি সততা। ‘জীবনে এর চেয়ে মূল্যবান কে বা কারা? সবার জন্য দুঃখ হচ্ছে আজ- সিনেমার এই উড়নচণ্ডীপনাকে যারা ধরতে পারল না, তাদের সবার জন্য। একটা সিনেমা যেন সিনেমা হয়ে উঠতে পারল না... এই দুঃখের থেকে বড় সুখ- আর একটি রূপকথা’র জন্ম দেখলাম। এডিটিং-এ বসে এক বছর আগে এসবই ভাবছিলাম---- ‘বাঁচার কি সুখ!...’
পুনশ্চঃ কার্তিক অনেক দিন ধরেই বলছিল—একটা সিনেমাও ইউটিউবে ছাড়ছ না কেন? বোঝানো মুশকিল, তাহলে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালগুলো ঝামেলা করে। কার্তিকই খড়গপুর আই আই টি’ তে বসে এই রদ্দি মার্কা প্রিন্টটা আপলোড করল (অবশ্য ওকে ওটাই দিয়েছিলাম)। ধন্যবাদ কার্তিক।
সবশেষে আর একটা কথা... আমার সহযাত্রী এবং পরিচালক শশী সরকার আমায় বলেছিল কয়েকটা ছবি আপলোড করতে... করলাম। সাথে লিঙ্কটাও শেয়ার করছি। আশাকরি অনুভব করবে---

* ''- শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বিভিন্ন লেখা থেকে ধার করা। 

No comments:

Post a Comment