Content

Sunday, July 19, 2015

ভুলে থাকার পাসওয়ার্ড

ভুলে থাকার পাসওয়ার্ড
(বিধিসম্মত সতর্কীকরণঃ এই লেখা কোন মহৎ সত্যের উদ্ঘাটন করেনা, বরং বেগের সাথে পা মিলেয়ে চলার সাথে সাথে ফেলে আসা আবেগের দিকে পেছন ফিরে চায়। তাই নেহাত ব্যক্তিগত আবোলতাবোল ছাড়া কিছু আশা করবেন না)।
বর্ষার সময় আমাদের শহর আরও সবুজ হয়ে যেত কাঁঠাল গাছের ডালে অর্কিড জমে থাকত। কালচে মেঘের ছায়া পড়ত ডিমা নদীর জলে। আলিপুরদুয়ারের বেশীরভাগ নদীতেই হাঁটু জল থাকে। তবে বর্ষায় ফুলে উঠত। তখন সাজো সাজো রব পড়ে যেত। সবাই পোটলা বাঁধত। দামী জিনিসপত্র সিলিঙে তুলে দিত। আমি তিরানব্বইয়ের বন্যা দেখেছি। এখনও অস্পষ্ট কিছু স্মৃতি রয়ে গিয়েছে। মাঝে মাঝে আকাশের গোঙরানি আর চপচপে হিউমাস কাদায় চপর চপর শব্দ আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখত। এরপর অবিরাম ধারাপাতমানকচুর ছাতা মাথায় আড়ষ্ট পায়ে ছুটে চলে স্কুল ফেরত কিশোর- কিশোরী...ক্রমশ বৃষ্টি ধারায় মুড়ে যেত সবকিছু। টিনের চালে ঝিমঝিম বৃষ্টির শব্দ ঢেকে দিত শহরের সব শব্দ। ডুয়ার্সের জঙ্গল প্রথম চিনেছিলাম বর্ষা কালেই। টিউশন থেকে পালিয়ে আমরা রাজাভাতখাওয়া’র জঙ্গলে যেতাম। এভাবেই জয়ন্তী পাহাড়ে গিয়েছিলাম। এরপর বয়স বাড়ার সাথে সাথে যখন অন্য জায়গাগুলোয় গিয়েছিলাম, তখন নিজেকে ট্যুরিস্ট মনে হয়েছিল। বেঁচে থাকাটাই কেমন নকল হয়ে যেতে থাকে।
বুক জুড়ে তখন অর্কিডের ঘ্রাণ। অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকতাম জঙ্গুলে ফার্নের দিকে। সাহস ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। সুযোগ পেলেই বন্ধুরাআলিপুরদুয়ার নিউটাউন গার্লস’-এর গলিতে চক্কর কাটে এভাবেই একদিন সরস্বতী পূজার সময় মেয়েদের স্কুলে ঢুকেছিলাম। হলদেটে বিকেলগুলো অদ্ভুত শান্ত। আমরা সাইকেল নিয়ে পাশাপাশি চলতাম। রাতে পড়া হয়ে গেলে অহেতুক ভাটবাজি করে অজস্র সময় নষ্ট করেছি।

এভাবে ভাবতে ভাবতে ক্রমশ স্মৃতিরা জুম আউট হয়ে যাচ্ছে... ধীরে ধীরে সমস্ত ক্লোজ শট কেমন যেন লং শট হয়ে যায়। মৃণাল সেনের আকালের সন্ধানের শেষ দৃশ্যের মত। বুক গোঙরানো কষ্টের চাঙর যেন মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। শতশত বছরের অবহেলা আর অনুযোগের দাস্তান। আসলে সাহিত্য, শিল্প, বিজ্ঞান সবেতেই ক্ষমতাশীলদের দাপাদাপি। ইতিহাসও বাদ যাবে কেন? শেষ সত্য বলে যা প্রতিষ্ঠিত, তা আসলে ক্ষমতাবানদের একান্ত নিজস্ব। এর ফলেই সৃজিত হয় বিভেদের প্রাচীর। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এ অঞ্চলের (শুধু এই অঞ্চল কেন, গোটা উত্তরবঙ্গের) ভাষা, কৃষ্টি , সভ্যতা আর ইতিহাসকে অবহেলা করা হয়েছে বছরের পর বছর। এ অঞ্চলের মানুষ কলকাতায় এলে মুখ খুলতে ভয় পায়, কেননা তাঁদের ভাষা শুনলে লোকে হাসে। এভাবেই ক্ষমতাবানদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বার বার আঘাত হানে সমস্ত আঞ্চলিক কৃষ্টির উপর।একারণেই ব্রাত্য থেকে যান অমিয়ভূষণ মজুমদার, জগন্নাথ বিশ্বাস, বেণু দত্ত রায় আরও অনেকে... ।
এখন আমি যখন  শহরে ফিরি, তখন অদ্ভুত সবুজ ভাললাগারা চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। আমি অনুভব করি, ছুঁয়ে দেখতে পারিনা। শহরটাও ক্রমশ বড় হচ্ছে। মাঝে মাঝে লোকগুলোকে বড্ড অচেনা লাগে। আগে পাড়ার মোড়ে মোড়ে সরস্বতী পুজো হ’ত। এখন অনেক কমে গিয়েছে। আগে বিকেল হলেই ক্রিকেট ছিল, এখন ফেসবুক। সবার ছেলেবেলার শহরের কী একই অবস্থা?
এখন আমার হাতে রঙের গন্ধ লেগে থাকে না। হাতে ডট পেনের আঁচড় গায়েব হয়েছে। রঙ-লেখা সব কম্পিউটারেই হয়। আমাদের প্রিয় সিরিয়াল ছিল- ‘শক্তিমান’। এখন ওসব দেখলে হাসি পায়! আমরা কী বোকা ছিলাম। আলিপুরদুয়ার আসলে ডুয়ার্সের অঘোষিত রাজধানীর নাম । কবির শহর আলিপুরদুয়ার। বেনু দত্তরায় কেমন আছেন? কিছুদিন আগে ‘দেশ’-এ ওনার কবিতা দেখলাম। জগন্নাথ বিশ্বাস মারা গিয়েছেন অনেকদিন। অদ্ভুত মানুষ। নেচার ক্লাবের একটা অনুষ্ঠানে প্রথম দেখেছিলাম। বিশ্বাস করা দায়, একজন রক্ত মাংসের মানুষ –যিনি কলকাতার নিওন আলো উপেক্ষা করে থেকে গেলেন বন-পাহাড়ের গলিপথে। মাঝে মাঝে পাহাড়ে ছড়িয়ে আসতেন অজস্র গাছের বীজ। এখনও অনেকেই কবিতা লেখেন। ফেসবুকের দৌলতে আঁতিপাঁতি সব্বাই কবি। শুধু দলবাজি করাটা জরুরী। জায়গা মত তেল দরকার। একমুখে ‘আনন্দ’কে গালি দিচ্ছে, আবার ‘দেশ’-এ লেখা প্রকাশিত হলে ফেসবুক ফাটিয়ে আপডেট দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠান বিরোধী ইমেজ বানানোর চেষ্টা ভাল। তবে ‘প্রতিষ্ঠানবিরোধী’ প্রতিষ্ঠান তৈরির  ঠুনকো আকুতি দেখলে ঘোড়ায় হাসে।
সেসময় অনেক লিটল ম্যাগাজিন বের হ’ত এ শহর থেকে। কেমন আছে ‘মাটির ছোঁয়া’? ‘নোনাই’ এখনও প্রকাশিত হয়? – অনেকদিন কারো সাথে কথা নেই। আমাদের ‘ধ্রুব’ কবেই বন্ধ হয়েছে। আমরাও এসব লেখালেখির বাইরে। শুধু
কম্পিউটার ভরিয়ে ‘গবেষণা পত্রের’ নামে ‘গো-এষণা’ করে যাচ্ছি।
এই প্রচণ্ড গতিকে অস্বীকার করার উপায় নেই। তবুও কয়েকটা কথা বলে নেওয়া দরকার। সোশাল নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল মাধ্যম- আমাদের অনেক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। অনেকদিনের আমাদের ছেলেবেলারা এখন আবার ‘হাই-হ্যালো’ করে নিজেদের মধ্যে। তবুও কোথায় যেন একটা ফাঁক থেকে যাচ্ছে। বড্ড তাড়াতাড়ি বুড়িয়ে যাচ্ছি। আসলে এভাবে বেঁচে থাকার একটা সুখ আছে। সেখানে খুশি নেই। এই অন্তর্জাল আমাদের ভুলে থাকার পাসওয়ার্ড দিয়েছে। সব ভুলে বেঁচে থাকার পাসওয়ার্ড।
এক বছর আগে ‘লেখালেখি’ ওয়েবম্যাগে ‘কামতাপুরের রাজপাট’ বিষয়ক একটা নিবন্ধে এই কথাগুলোই লিখেছিলাম। সেই লেখা থেকে অনেকটা অংশ তুলে দিচ্ছি এখানে-
আজ আট বছর আমি ঘরছাড়া।কিন্তু আমি ভুলিনি।জঙ্গলে জঙ্গলে, চিলারায়ের বিলুপ্ত রাজপাটে ভুত-পেত্নীর মত জেগে থাকে অজস্র স্মৃতি, ইতিহাস। যে ইতিহাস গোঁসানিমারি রাজপাট অতিক্রম করে আঠারোকোঠা পেরিয়ে বিধৃত হয়েছিল অসমে। পর্তুগীজ পর্যটক স্টিভেন ক্যাসিলার চিঠি এখনো খোঁজ করে চলেছে হিঙ্গুলাবাসের রাজপাটের।  হয়ত ফেরার পথ নেই। কেননা ভাল ভাবে বাঁচতে হলে কলকাতা ছাড়া উপায় নেই।সেই উপায় এখনো কোন সরকার তৈরি করেনি। এখনো আমার বাড়ির কাছে কোন বন্ধ চা বাগানে, পাহাড়ে অরন্যে জেগে ওঠে সভ্যতার আদিম সন্তানরা। অন্ন বস্ত্রের শোক ভুলে... উৎসবের মাদকতায়। সমস্ত দিন বন্ধ চা বাগানের সামনে আন্দোলনে পোজ দিয়ে ... বিষাক্ত কচু খুঁজে ঘরে ফেরে সাইলও, রাবু, কৃষ্ণপাহাড়ের ছায়া পড়ে তখন গ্রামের উঠোনে। তারপর ভাঙা ঘরের ফুটিফাটা চাল চুইয়ে চাঁদের আলোর ধারা নেমে আসে সারা গ্রামে। জার-ইউ-হাঁড়িয়ায় মদ্যপ অসভ্যরা মেতে ওঠে আদিম প্রমিস্কিউতিতে। জেগে ওঠেন দাই চিকো শিরিসাবট্রপিকাল চিরহরিৎ অরণ্যে শোনা যায় ধামসার নিনাদ। চাঁদের দিকে তাকিয়ে তখন কোন কোন আ্যবওরিজিনালপ্রশ্ন করে ... বহু পুরনো প্রশ্ন। ধামসা-মাদলের আদিম আবহে খোলা আকাশের নীচে দাঁড়ানো সেই আদিবাসী কণ্ঠে জেগে ওঠে প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের আফ্রিকার গানএর মত কোন দেশজ গান।সে গানে কোন জিঘাংসা নেই, কোন শ্লেষ নেই। বরং উৎসবের তালে তালে মূর্ত হয় একটি সরল অথচ আদিম প্রশ্ন। সব থেকে আদিম প্রশ্ন। চিলারায়ের রাজপাটের থেকেও, আফ্রিকার থেকেও, মানুষের থেকেও, সভ্যতার থেকেও আদিম প্রশ্ন।

হে হে...হেই হে... এ...এ...এ...এ...
ছোকরা চাঁদ, জোয়ান চাঁদ/ ছোকরা চাঁদ, জোয়ান চাঁদ/ ছোকরা চাঁদ, জোয়ান চাঁদ
হে হে...হেই হে... এ...এ...এ...এ...
খবর শোনাও, একটা ছোট্ট খবর তো শোনাও ভাই... শোনাও ভাই...শোনাও ভাই
হে হে...হেই হে... এ...এ...এ...এ...
ছোকরা চাঁদ, জোয়ান চাঁদ/ ছোকরা চাঁদ, জোয়ান চাঁদ/ ছোকরা চাঁদ, জোয়ান চাঁদ
হে হে...হেই হে... এ...এ...এ...এ...
যখন সূর্য উঠবে, ভোরের আলো ফুটবে/ তোমায় সেই খবরটা বলতে হবে-
হে হে...হেই হে... এ...এ...এ...এ...
কি জানতে চাই, আহা! ব্যস্ত কেন- এখনই তা বলছি শোন
সূর্য উঠবে যবে/ কানে কানে বলে যাবে---
কেমন করে কিছু খেতে পাই, কিছু খেতে পাই?
কেমন করে কিছু খেতে পাই, কিছু খেতে পাই?  

No comments:

Post a Comment