Content

Monday, March 14, 2016

Amir Khan 51


Wednesday, February 24, 2016

বইয়ের খবর



 দণ্ডকারণ্যের অন্ধকারে
ভেরিয়ার এলউইনের সাথে যেদিন আমার প্রথম ঘনিষ্ঠ আলাপ হলো, সেদিনই তিনি আমাকে বললেন, তোমাকে আমি ভারতের সব চাইতে রোমাঞ্চকর আদিবাসীদের দেশে নিয়ে যাব। অনেক ক্ষেত্রে আফ্রিকার আদিবাসীদের চাইতেও তারা ভয়ঙ্কর।
- এভাবেই বইটা শুরু হয়েছে।
নৃতত্ত্ব নিয়ে যারা খোঁজ রাখেন, তাঁদের কাছে ভেরিয়ার এলউইনের নাম নতুন নয়। ভারতীয় নৃতত্ত্ব গবেষণার প্রাণপুরুষ ভেরিয়ার এলউইন এদেশে এসেছিলেন ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে। এরপর সব কিছু ছেড়েছুড়ে হয়ে গেলেন গবেষক এলউইন।

আশুতোষ ভট্টাচার্যের লেখা ‘দণ্ডকারণ্যের অন্ধকারে’ আরও নতুন ভাবে চিনিয়ে দেয় মানুষ এলউইনকে। এই বইটিই বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম ‘নৃতত্ত্ব-মূলক ভ্রমণ’-এর বই। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনার চাকরি ছেড়ে লেখক নাম লেখালেন ভারতের নৃতত্ত্ব সমীক্ষায় (Anthropological Survey of India)। পরে ১৯৫৫ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আধুনিক ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ’-এ যোগ দেন। মাঝের আট বছর তিনি কাটিয়েছেন সমীক্ষার কাজে। লেখকের ভাষায়- ‘এই বৃত্তান্তটি ‘দণ্ডকারণ্যের অন্ধকারে’ এই নামেই ‘দৈনিক বসুমতী’ পত্রিকায় প্রতি রবিবারের সংখ্যায় কিছুকাল ধরে ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়েছিল’।
ডঃ ভেরিয়ার এলউইনের সাথে তাঁর কাজ করার দুর্লভ অভিজ্ঞতা বিধৃত হয়েছে এই বইয়ে। বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। এইমাত্র শেষ করলাম।
দ্বিতীয় খন্ডের খোঁজ থাকলে দয়া করে জানাবেন।

Monday, February 8, 2016

বিতান চক্রবর্তীর ‘শান্তিরামের চা’



এই সরলতা অনেকদিন গায়েব ছিল
সারাংশ অথবা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া
অনেকদিন এভাবে আমরা কথা বলিনি। এই আপাত সরলতায় যে কোন ঘটনাকে বিধৃত করার ক্ষমতা অনেকদিন হারিয়েছি আমরা। দ্রুত বাড়তে থাকা নাগরিক কলেবর আর বক্র জীবনবোধের প্রবল চাপ সামলাতে গিয়ে দেখার চোখ নির্মলতা হারিয়েছে অনেকদিন। বলার ঠোঁট হারিয়েছে সোজাসুজি কথা বলার ক্ষমতা। অথচ অতিমাত্রায় সরলীকরণ নেই। কোন চমক নেই। আছে শুধু ঘটে যাওয়া সময়ের বিবরণ। বিতান চক্রবর্তীর গল্পগ্রন্থ ‘শান্তিরামের চা’ পড়ে এটাই মনে হ’ল। চলতি কথায় যাকে বলে ‘তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া’।
গৌরচন্দ্রিকা
বিতান চক্রবর্তী’র লেখার সাথে আমি একেবারেই পরিচিত ছিলাম না। বস্তুত সামাজিক সংযোগ মাধ্যমের এই বিপুল জনপ্রিয়তার যুগে অজস্র আনকোরা মুখ তাদের ফেসবুক স্ট্যাটাস, ব্লগের পাতায় শব্দমালা সাজিয়ে বারবার চমকে দেয়। চমক শুধু ভাষা , শব্দবন্ধ নির্বাচনে নয়, বরং বিষয়-আঙ্গিকেও একটা ঝাঁকুনি অনুভূত হয়। একদশক আগেও মত প্রকাশের বিভিন্ন মাধ্যম কুক্ষিগত ছিল বড় প্রকাশনা সংস্থার সাথে যুক্ত সীমিত বড় বড় মুখের কাছেই। অথচ এখন মনে হয় মত প্রকাশের ভিন্নতর আঙ্গিক উন্মোচিত হয়েছে  সামাজিক সংযোগ মাধ্যমের চূড়ান্ত বাড়বাড়ন্তের ফলেই। এ এক অদ্ভুত সহাবস্থান। যত মত তত পথ। এর স্বাভাবিক ফলশ্রুতি হিসেবেই সাধারণ পাঠক নতুন লেখকদের প্রতি বাড়তি কনফিডেন্স পেয়েছেন । এখান থেকেই সৃজিত হ’ল পাঠক-লেখক ফিডব্যাক সিস্টেম। এই মাধ্যম এতটা প্রত্যক্ষ ভাবে লেখক-পাঠককে যুক্ত করেছে যা  আগেকার সিস্টেমে কল্পনাতীত ছিল। ফলত, এখন একজন নতুন লেখকের (পড়ুন অখ্যাত/ স্বল্পখ্যাত লেখকের) বই কিনে নেওয়ার ঝুঁকি পাঠক নিতেই পারে। 
 ‘ফেরারি’ ওয়েবম্যাগে কিরীটী সেনগুপ্ত’র লেখা প্রিভিউ পড়েই বইটি সংগ্রহ করতে উৎসাহী হয়েছিলাম।  বাংলা সাহিত্যে প্রিভিউয়ের নমুনা বিশেষ একটা পাওয়া যায় না। মূলতঃ সিনেমার প্রিভিউতেই আমরা অভ্যস্ত। সেদিক দিয়ে বিচার করলে বই প্রোমোশনের ক্ষেত্রে এটা একটা অনুকরণীয় এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
গপ্পের গভীরে
শীতের অন্ধকার রাতে যেভাবে স্তূপীকৃত হয় ইতিউতি ছড়িয়ে থাকা জ্বালানি, যেভাবে ক্ষণিকের প্রশান্তি বারবার শীত দূর করার ভ্রম তৈরি করে আর শেষ রাতে আবার ঘনিয়ে আসে শীত, যেভাবে ভোর রাতে জড়িয়ে ধরি লেপের উষ্ণতা, অনেকটা সেভাবেই গল্পগুলো তৈরি করেছে কিছু খন্ডচিত্র। স্থানভেদে কখনও পরস্পরবিরোধী আবার কখনও ঘটনাগুলো একে অপরের পরিপূরক। এই পরস্পরবিরোধীতা আমাদের মজ্জাগত। এখানেই জিতে যান বিতান চক্রবর্তী। আমাদের অনধিগম্যতাকে তিনি ছুঁয়ে যান ঘটনা পরম্পরায়। 
উদাহরণ হিশেবে ‘শান্তিরামের চা’ গল্পটিকে ব্যবহার করা যায়। শান্তিরামের ছোট ছোট সমস্যা মিটে যেতেই পারত। তাঁর ছেলে শিক্ষাটা ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলেই শেষ করতেই পারত, তাঁর হলদেটে হিসেবের খাতার বদলে কম্পিউটারের এক্সেল শিট স্থায়িত্ব লাভ করতেই পারত। যেভাবে সত্যজিতের ‘জনঅরণ্য’ সিনেমায় হয়েছিল। চূড়ান্ত সাফল্যের সমান্তরালে মানবিক অবক্ষয়ের চিনচিনে বুক দোমড়ানো ব্যথা নিয়ে শান্তিরাম বাঁচতেই পারতেন, কিন্তু বাঁচেন নি। বরং তিনি ফিরেছেন শেষ রাতের শীতল কাঁপুনিতে। লেপ আঁকড়ে ধরতে চেয়েছেন, আবার সন্ধ্যার আগুন তাপানো উষ্ণতাকে সভ্যতার বিভ্রম বলে ভেবেছেন। কেননা, চায়ের দোকানে বিয়ারের বোতল রেখেও আমতা আমতা করেছেন। তবুও তিনি ফিরতে চেয়েছেন শীতের দুপুরের উষ্ণতায়। একটা অদ্ভুত মানবিক বোধ থেকে এই ফেরার সিদ্ধান্ত। এই বিরল মানবিক চেতনা, যার ভেতরে কোন মহত্ত্ব নেই, আছে শুধু বাঁচার আকুতি। এইসব আকুতিকে অনাবিল সারল্য ছাড়া প্রকাশ করা মুশকিল। আর এই সারল্য ছড়িয়ে আছে বিতানের গদ্য জুড়ে। অথচ এই গল্পের প্লট সজ্জা আহমরি নয়, তবুও পড়ে যাওয়া যায় এই নিখাদ সারল্যের টানে।
সমস্ত বই জুড়ে মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের শ্বাস- প্রশ্বাস অনুভব করা যায়। নিঃশ্বাসের উষ্ণতায় গলে গলে পড়তে থাকে জামাটবদ্ধ অন্ধকার। যুগজীর্ণ ইতিহাস আর অতীতবেত্তা শব্দমালা একটা প্রস্থানপথ খুঁজে পায় ‘শহিদবেদি’ গল্পে। নিঃসাড়ে তথ্যচিত্রের ভেতরের তুচ্ছচিত্ররা যেন মেট্রিক মন্তাজ তৈরি করে। ঠিক যেন সিনেমার মতো ভাষা। দৈর্ঘ্য অনুযায়ী অজস্র শট আর কাটাকুটি দৃশ্যের সমাহার তৈরি হয়। ক্রমে বিতানের ভাষা আর গল্পের ট্রিটমেন্টে প্রগাঢ় ভাবে দৃশ্যমান হতে থাকে গতিময়তা আর ভাষার অন্তর্ছন্দের সংঘাত। একটা অদ্ভুত ‘Mental Pictorialism আমরা ক্রমে প্রবেশ করি ‘টোনাল মন্তাজে’র মতো ‘বিষয়বস্তুর বিভিন্ন মাত্রার টোনালিটির সংঘাতে’।
“ ক্যামেরা এখন গ্রামে ঢুকে পড়েছে। ফ্রেমে একটা হেলে-পড়া বাড়ির ভেঙে পড়া বারান্দা। কয়েক ফালা রোদ্দুর বারান্দায় টান-টান হয়ে শুয়ে আরাম করছে। আশেপাশে ঝোপঝাড় পার করে কিছু ঘর দেখা যায়। দু-একজন মহিলার মুখ উঁকি মারে। ক্যামেরা ওদিকে ঘুরতেই মুখগুলো দেওয়ালের পেছনে অদৃশ্য হয়ে যায়। বারান্দায় এক বৃদ্ধ বসে আছেন। ‘এখানে আপনারা কেমন আছেন?’ কেউ একজন প্রশ্ন করে। ” (শহিদবেদি, পৃষ্ঠা- ৫৫)
এর একটু আগেই আমরা অন্যরকম একটা দৃশ্যের সম্মুখীন হই- “ এই প্রথম অরিন্দমকে ক্যামেরাটা সারা টিভি জুড়ে ধরেছে... একটা গাছের তলায় ছেলে-মেয়েগুলো বসে আছে। অরিন্দম ওদেরকে আজ অক্ষর জ্ঞান দেবে। ” (শহিদবেদি, পৃষ্ঠা- ৫৪)
এই দু’টি দৃশ্যের মাঝে একটা খন্ডদৃশ্য- “ সঞ্চালক আবার আলোচনা থেকে সোজা ফিরে গেছে তথ্যচিত্রটায়। প্রথমেই অরিন্দমের ক্ষতবিক্ষত শরীরটা”। (শহিদবেদি, পৃষ্ঠা- ৫৫)
এভাবেই বিতান ক্রমাগত তৈরি করেছেন অজস্র দৃশ্যের কোলাজ। মাঝেমাঝে আঁতকে উঠতে হয়। অথচ কোনটাই আরোপিত নয়। এখানেও নিখাদ সারল্য রয়েছে। তবুও আঁতকে উঠি কেননা, এভাবে আয়নায় মুখ দেখা বড্ড বেদনার। আমাদের অজ্ঞানতা না বধিরতা- কোনটা বেশী ভয়ঙ্কর? ঝাঁকুনি দিতে না চেয়েও বিতান আমাদের ঝাঁকিয়ে দেন এভাবেই।
মধ্যবিত্তের প্রতিদিনের সমস্যা আর তাকে ঘিরে বেঁচে থাকার আকুতি নিয়েই গল্পগুলো এগিয়ে যায়।  কোন ডেফিনিট ডেসটিনেশন নেই।  শুধু একটা যাত্রা। আর যাত্রাপথ জুড়ে কিছু অভিজ্ঞতা জড়ো হয়। চরিত্রদের ক্রাইসিসগুলো ফিরে ফিরে আসে। যেমন ‘বোগেনভিলিয়া’ গল্পে আছে বাংলা মাধ্যমে পড়া ছেলের ‘কমিউনিকেশন প্রবলেম’। আবার একই সমস্যা উঠে এসেছে ‘শান্তিরামের চা’ গল্পে।
– মানেটা সহজ মৌ, নেবে না, মানে চাকরিটা হয়নি।
-          কী সমস্যা ছিল?
সঞ্জীব শান্ত গলায় টোস্ট দিতে আসা ভদ্রলোকটিকে এক গ্লাস জল দিতে বলে। মৌ এক দৃষ্টে চেয়ে আছে সঞ্জীবের দিকে। সঞ্জীব অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে উত্তর দেয়-
-          ওই, কমিউনিকেশন প্রবলেম!
-          ওফ্, তোমাকে কতবার বলেছি স্পোকেনে ভর্তি হও!
-          দ্যাখো মৌ, গ্র্যাজুয়েশনটা এমনি এমনি পাশ করিনি আমি! হ্যাঁ আমেরিকান প্রোনাউনসিয়েশনটা হয়তো আমার কাঁচা, কিন্তু বাকি যা আছে ওতে সারা কলকাতায় কাজ চলে যায়।
-          এখন যে চলছে না তা বুঝতে পারছ”? (বোগেনভিলিয়া, পৃষ্ঠা ১৩)
আবার ‘শান্তিরামের চা’ গল্পে ফিরে এসেছে এই প্রসঙ্গ- “ হ্যাঁ তোরই একটা ছেলে হয়েছে! আমাদের তো আর হয়নি! সব ওই বাংলা  ইস্কুলে পড়েই মানুষ হয়ে গেল রে, আর ওনার ইংরেজি ইস্কুল”! (শান্তিরামের চা, পৃষ্ঠা ৩৫)
এসবের সাথে যুক্ত হয়েছে আর্থ-সামাজিক আঙ্গিক। ‘বোগেনভিলিয়া’র শেষে সমস্ত অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো একটা সান্দ্র আবহাওয়া তৈরি করে। যেখানে মন কেমন করা আর্দ্রতা ভিজিয়ে দেয় বইয়ের পাতা।
কয়েকটি গল্পে বারবার ফিরে এসেছে লোকাল ট্রেনের ভিড় আর চপচপে ঘামের গন্ধ।   ‘মিথ্যে ঘটনা অবলম্বনে’ পুরোপুরি নিম্নমধ্যবিত্ত সমাজের আখ্যান। লোকাল ট্রেনের ঘর্মাক্ত কলেবর আর কাঞ্চনাকে ঘিরে তৈরি হওয়া চেনা-অচেনা ইতিবৃত্ত কতগুলো সহজ সত্যকে তুলে ধরে। এখানে কোন কিছুই আরোপিত নয়। কতগুলো ঘটনার ধারাবিবরণী কখন যেন গল্প হয়ে ওঠে। ক্রমাগত অন্ধকারে তলিয়ে যেতে যেতে ব্যাপ্ত হয় রাতের গভীরতা। মাঝে মাঝে কয়েকটি বলিষ্ঠ উচ্চারণে পাঠকের মোহ ভাঙে। যেন নির্জ্যোৎস্নায় কেঁপে কেঁপে ওঠে পথ হারানো পথিকের শরীর। এই ঝাঁকুনি এতটা স্বাভাবিক ভাবে এসেছে বলেই শেষ অবধি মূর্ছনা রয়ে যায়।
ভিন্নতর ট্রিটমেন্টে একই গল্প ফিরে এসেছে ‘শীতের শহর’-এ। যদিও প্রেক্ষাপট আলাদা তবুও একটা অদ্ভুত মিল। এখানেও ট্রেনের কামরা ফিরে এসেছে। ফিরে এসেছে ‘ইংরেজি পেপার আর কে পড়ে বাড়িতে’! পড়তে পড়তে সংবেদনশীল পাঠক বুঝতে পারবেন, এই জীবন লেখককে ভাবায়, লেখায়। তাঁর বড্ড কাছের। একান্ত ব্যক্তিগত। এই সহমর্মিতা শুধু নিজের জীবনের প্রতিই দেখা যায়।
‘পারলেই রাজা’র প্লট তুলনামূলকভাবে জটিল। তবে ভাষা আর প্রকাশভঙ্গীর সরলতার জন্য সমস্ত জট খুলে একটা নির্মেদ আকার নিয়েছে। এখানেও ফিরে ফিরে এসেছে  সেই সব প্রসঙ্গ যাদের নিয়ে এতক্ষণ বলা হ’ল। মোদ্দা কথাটা হ’ল, ‘কৃষ্ণ তুমি কেমন?/ - যার মন যেমন’।
আবার বলছি প্রসঙ্গগুলোর বারবার ফিরে আসায় বইটি একঘেয়ে হয়ে যায়নি, বরং স্পষ্টভাবে বলার বিষয় পেয়েছে। এই বিষয় আবর্তিত হয়েছে যাঁদের নিয়ে তাঁরা সমকালীন সাহিত্য-সিনেমায় ব্রাত্য থেকে যান। বিতান এই কাজটা করতে পেরেছেন, কেননা এখানে কোন চাটুকারিতা নেই।
হন্তারকঃ জাদু বাস্তবতা নাকি বাস্তবতার জাদু
এই গল্পগ্রন্থের সাতটি গল্পের মধ্যে ‘হন্তারক’ আলাদা করে আলোচনার দাবী রাখে। বইয়ের কভারেও পৃথকভাবে এই গল্পের উল্লেখ আছে। “ বাংলা সাহিত্যে যদি কোনদিনও সৃজনশীল অনুশীলন বিষয়ক আলোচনা হয়, হন্তারক তার পুরোভাগে থাকবে। ম্যাজিক রিয়ালিজম গোত্রের একটি ছোটগল্প”
প্রসঙ্গত; জাদু বাস্তবতা নিয়ে কয়েকটি কথা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। ঊনিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে মূলত চিত্রশিল্পে ‘ম্যাজিক রিয়ালিজম’ নামক শব্দবন্ধটির ব্যবহার শুরু হয়। এরপর ক্রমে সাহিত্যে প্রবেশ ঘটে জাদু বাস্তবতার। রূপকথার অবাস্তব মায়াবী কুহক মিশে গেল বাস্তবের মাটিতে।  এর অভিঘাতে বদলে গেল সাহিত্যের ভাষা। বলাবাহুল্য, ম্যাজিক রিয়ালিজম আর গ্যাব্রিয়েল গারসিয়া মার্কেজ এখন সমার্থক। অথচ একই উপাদান পাওয়া যায় গুন্টার গ্রাস অথবা হর্হে লুইস বর্হেজের লেখায়। তবুও মার্কেজ এই ধারার সার্থক রূপকার। ষাটের দশকে মার্কেজ যখন দারিদ্র আর তার নিদারুণ অভিঘাতে ভারাক্রান্ত, তখনও তিনি ক্রমাগত লিখে যাচ্ছিলেন। আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা তাঁকে ছুয়েছিল, অথচ তিনি একবিন্দু রক্তের কথা না বলে অনেক আগেই লিখেছিলেন এক নিঃসঙ্গ নাবিকের আখ্যান। যিনি বলেছিলেন, ‘অনেকদিন পর এরকম একটা স্বাভাবিক মৃত্যু দেখলাম’। ভেবে দেখুন, রক্তপাতের বর্ণনা ছাড়াও এভাবে হিংসা আর তার ইমপ্যাক্ট বর্ণনা করেছিলেন তিনি। এখান থেকেই শুরু হয়েছিল বাস্তবতার সাথে লুকোচুরি। এরপর ১৯৬৫ সালে যখন তিনি পুত্র আর স্ত্রীকে নিয়ে আলকাপুলশোর দিকে যাচ্ছিলেন, তখনই তাঁর মাথায় ভিড় করতে থাকে ছেলেবেলায় শোনা ভুত-প্রেতের গল্প। ছেলেবেলার শহর আরাকাটকা’র স্মৃতি। শহরের বুকে জমে থাকা অজস্র যুগজীর্ণ লোকগাথা। ভেসে ওঠে বৃদ্ধা দিদার মুখ। মাকুন্দো নামে একটি কাল্পনিক শহর তৈরি করলেন। দিদার মুখে গল্প শোনার সময় তিনি যে অভিব্যাক্তি দেখেছিলেন, তা যেন বলিরেখার মতো চামড়ার স্তরে জমে ছিল। তিনি এইসব গল্পে বাঁচা শুরু করলেন। কেননা, তিনি বিশ্বাস না করলে পাঠক বিশ্বাস করবে কি করে? এরপর ঘরবন্দী হয়ে লিখে ফেললেন ‘একশ বছরের নিঃসঙ্গতা’। বাকিটা ইতিহাস। তবে আমার মনে হয়,  মার্কেজের লেখায় ঘুরেফিরে আসা মানুষেরা অথবা লাতিন আমেরিকার আদিবাসী সমাজ, তাঁদের নাচ-গান, ভুত-প্রেত, সব কিছু ছাপিয়ে অজস্র প্রতিবন্ধকতার সমান্তরালে বেঁচে থাকাটাই নিদারুণ বাস্তবতা। এভাবে মানুষ বেঁচে আছে, এটাই ম্যাজিক। তাই এই ধরণের লেখাগুলো যতটা জাদু-বাস্তবতার কথা বলে, তার থেকেও গভীরতায় প্রতিভাত করে বাস্তবতার জাদুকে।
ফিরে আসা যাক, বিতানের ‘হন্তারক’ গল্পে। এখানে স্বপ্ন আর বাস্তব মিলেমিশে যায়। সিরিয়াল কিলার আর একটা অন্ধকারের লেয়ার আছে। একটা ঘোর লেগে থাকে সারা গল্পে।  প্রকারবিহীন অলৌকিক পরিবেশের পাশাপাশি রয়েছে বেকারত্বের গল্প। এখানে পুরনো বিতান ফিরে আসেন। বিতানের সমস্ত চরিত্ররা এক হয়ে যায় যেন। নিদারুণ ধাক্কা অথবা অভিঘাতেও নায়ক বেঁচে থাকে। এই বেঁচে থাকাটাই বাস্তব। যেভাবে আমরা রোজ সহিষ্ণু প্রতীক্ষায় বেঁচে থাকি।  এটাই বাস্তব। আর এখানেই ম্যাজিক! তাই এই গল্পটি জাদু বাস্তবতার মোড়কে বাস্তবতার জাদু’র কথা মনে করিয়ে দেয়।
অতিরিক্ত দু’একটি কথা  
আনন্দ পাবলিশার্সের বইয়ে একটা অদ্ভুত ঘ্রাণ থাকে। সে ঘ্রাণ তার আভরণের জন্য এতটা প্রগাঢ়। এ বইয়ে অবিকল সেই ঘ্রাণ পেয়ে যাবেন। ঝকঝকে ছাপা। চকচকে পাতা। তমোজিৎ ভট্টাচার্যের আঁকা অনবদ্য প্রচ্ছদ স্বীকৃতির দাবী রাখে। সাব্বাস শাম্ভবী প্রকাশন!
শান্তিরামের চা
বিতান চক্রবর্তী
প্রকাশক- ভাস্বতী সেনগুপ্ত, (শাম্ভবী – দ্য থার্ড আই ইমপ্রিন্ট)
মূল্য- ১৮০/-
ISBN- 978-93-85783-56-2 (Indian Edition, Hard Bound)


Friday, February 5, 2016

Mistake!!!


FishyToon


Friday, December 25, 2015

বড়দিন নিয়ে ১০টি বড় অদ্ভুত খবর


বড়দিন নিয়ে ১০টি অদ্ভুত খবর
২৫শে ডিসেম্বর মানেই বিশ্ব জুড়ে আনন্দের ঢেউ । পরমপিতার নিজের ছেলের জন্মদিন। অথচ গবেষকরা জানিয়েছেন, ২৫শে ডিসেম্বর যে প্রভু যিশুর জন্মদিন, এবিষয়ে নিশ্চিত কোন তথ্যপ্রমাণ নেই। অনেকেই মনে করেন যীশুর জন্ম হয়েছিল বসন্ত কালে। তবুও সারা বিশ্বই এই দিনটিকে তাঁর জন্মদিন হিসেবে পালন করে।  এখন বড়দিন শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, আনন্দের উৎসব। বড়দিনে মাতোয়ারা হওয়ার আগে জেনে নিন অদ্ভুত কয়েকটা তথ্য ।
১০) সান্টাক্লজের নাকি স্ত্রী আছে
 বড়দিন বলতেই পেটমোটা, লাল জামা আর দুধ সাদা দাড়ির সান্টাক্লজের কথা মনে আসে। তাঁর সাথে থাকে হরেক উপহারের ঝোলা। উত্তর আমেরিকার লোকগল্প অনুসারে সান্তা বুড়োর আসল নাম, ক্রিস ক্রিংল। তিনি ছোটদের খেলনা তৈরি করতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম জেসিকা। অনেকে মিসেস ক্লজও বলে থাকেন। তবে তাঁর আরও নাম আছে।
তাঁর কথা প্রথম ১৮৪৯ সালে জেমস রিস তাঁর ছোটগল্প "A Christmas Legend"- এ বলেন। এরপর ১৮৫১ সালে ‘A B’ ছদ্মনামে এক তরুণ গবেষক, তাঁর লেখায় মিসেস ক্লজের কথা বলেন।
৯) সব থেকে বড় ক্রিসমাস ট্রি
বাজারে আমরা নকল ক্রিসমাস ট্রি দেখে থাকি। আসল ক্রিসমাস ট্রি হিসেবে সবুজ পাইন, ফারের মত কনিফার জাতীয় গাছ ব্যবহার করা হয়। এ নিয়ে সারা বিশ্বেই আদিখ্যেতা দেখা যায়। তবে ১৫-১৬ শতকে জার্মানিতেই প্রথম ক্রিসমাস ট্রি’র ব্যবহার শুরু হয়।
তবে সবাইকে চমকে দিয়ে ওয়াশিংটনের নর্থগেট শপিং সেন্টার ১৯৫০ সালে একটি ২২১ ফুট লম্বা ফার গাছ থেকে ক্রিসমাস ট্রি বানিয়েছিল। এটা গিনেজ বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডেও স্থান পায়। ১০-১২টা জিরাফ পরপর একে অপরের উপরে দাঁড়িয়ে গেলে এই ক্রিসমাস ট্রি’র সমান লম্বা হতে পারবে!
৮) ইংল্যান্ডে অদ্ভুত ডিনার
ইংল্যান্ডে বড়দিন উপলক্ষে অনেকেই কাসুন্দি দিয়ে শুয়োরের মাথা মাখিয়ে খায়। তবে এই পরম্পরা এখন বিলুপ্তপ্রায়। ও হ্যাঁ, ইংরেজরা এই ডিনার সারতেন শেষ বিকেলে।
৭) সান্টাক্লজের আসল নাম সেন্ট নিকোলাস
একটু আগেই বলেছিলাম, সান্তা বুড়োর আসল নাম, ক্রিস ক্রিংল। এই নিয়ে অনেক গল্প প্রচলিত আছে। অনেকেই মনে করেন সান্টাক্লজ নামটি এসেছে এক সেন্ট নিচোলাস নামক এক তুর্কি পাদ্রীর নাম থেকে। চতুর্থ শতকে সেন্ট নিকোলাস তাঁর দানধ্যানের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তিনি শিশু মহলে খুব জনপ্রিয় ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে অজস্র গল্প তৈরি হয়। তাঁর নাম ডাচ লোকেরা ভুল উচ্চারণ করত।  সেন্ট নিচোলাস হয়ে গেলেন সেন্ট নিকোলাস। আরও সুবিধের জন্য তাঁর নাম অনেকেই রাখলেন সিন্টার ক্লাস।  এই নাম আরও ছোট হতে হতে সান্টাক্লজ হয়ে যায় একসময়।
৬) কলম্বিয়ার জঙ্গলে বড়দিনের আলো
২০১০ সালে কলম্বিয়া সরকার বড়দিন উপলক্ষে তাঁদের সমস্ত বনভূমি আলোয় ঢেকে দিয়েছিলেন। এটা আসলে একটা বিশেষ ক্যাম্পেন ছিল। যখন ফারক গেরিলা সন্ত্রাসীরা এই বনভূমি দিয়ে যাচ্ছিল, তখন বনের বিভিন্ন গাছে লাগিয়ে রাখা পোস্টার তাঁদের চোখে পড়ে। এরপর ৩৩১ জন সন্ত্রাসবাদী সমাজের মূলস্রোতে ফিরে আসে।

৫) বড়দিন উপলক্ষে ভূতের গল্প
বড়দিন উপলক্ষে ভূতের গল্প বলার নিয়ম আগের শতাব্দীতেও ছিল। ২০০১ সালে সেন্ট মারটিন প্রেস থেকে প্রকাশিত Inventing The Victorians’ বই থেকে জানা যায় যে বড়দিন উপলক্ষে ভূতের গল্প বলার রেওয়াজ ভিক্টোরিয়ান যুগেও ছিল। শুধু গল্প বলার এই রীতিকে ইংরেজ লেখকেরা এরপর তাঁদের সাহিত্যে নিয়ে আসেন। এরপর ‘ঘোস্ট অফ ক্রিস্টমাস’, ‘ক্রিস্টমাস স্পিরিট’-এর মত অজস্র জনপ্রিয় ভূতের গল্পের সিরিজ প্রকাশিত হতে থাকে। এমনকি চার্লস ডিকেন্সের লেখাতেও বড়দিনের ভূতের গল্পের উল্লেখ আছে।
৪) বিশ্বযুদ্ধের ময়দানেও বড়দিন উদযাপিত হয়েছিল
১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি আর ব্রিটেনের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছিল। ২৫শে ডিসেম্বর দু’পক্ষই নিজেদের ক্যাম্প, যুদ্ধক্ষেত্র সাজিয়ে ছিল। এমনকি নিজেদের মধ্যে উপহারের আদানপ্রদানও হয়েছিল। এই উপলক্ষে দু’পক্ষের মধ্যে প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আয়োজনও হয়েছিল। অজস্র রক্তপাতের মাঝেও মানুষ উৎসবে মেতেছিল, তাঁদের বাঁচার আকুতি থেকেই।

৩) বড়দিনঃ সুইডেনের লোকেদের কাছে ‘ডোনাল্ড ডাক’ দেখার দিন
ডোনাল্ড ডাকের নাম কে না শুনেছে! ছেলেবেলায় আমাদের প্রিয়তম কার্টুন চরিত্রগুলোর একটা। সুইডেনের লোকেরা ডোনাল্ড ডাককে বলে ‘কাল্লে আঙ্কা’। ২৫শে ডিসেম্বর সপরিবারে, একাএকা, দু’জনে মিলে ‘কাল্লে আঙ্কা’ বা ডোনাল্ড ডাকের কার্টুন শো দেখাই সুইডেনের ট্র্যাডিশন। এসময় রাতের খাবার তৈরি করা যাবে না। এমনকি কার্টুন শো চলাকালীন রাতের ডিনার সারা যাবে না। বিগত ৫০ বছর ধরে সুইডেনে এটাই রীতি। বিকেল ৩টায় শো শুরু হয়, এসময় সব দোকান-পাট বন্ধ থাকে।
২) সান্টাক্লজের জামা নাকি কোকাকলা’র দেওয়া
১৮০৪ সাল। নিউইয়র্ক হিস্টোরিকাল সোসাইটি’ র মিটিঙে জন পিন্টারড একটি কাঠের মূর্তি দেখালেন। মিস্টি হাসির বুড়োর মূর্তি। সাথে ঝোলা ভর্তি খেলনা। নাম সেন্ট নিক। ধরে নেওয়া হয় এটাই সান্টাবুড়োর প্রথম মূর্তি। সে সময় সান্টাবুড়ো নীল, সবুজ আর সাদা রঙের জামা পড়ত।
তবে আমরা সান্টাক্লজের যে রূপ দেখতে অভ্যস্ত, তা বাজারে নিয়ে আসে কোকাকোলা। ১৯২০ সালে The Saturday Evening Post পত্রিকায় প্রথম দেখা যায় আধুনিক সান্টাক্লজকে। এরপর ১৯৩০ সালে আবার বড়দিনের সময় কোকাকলা বাজারে নিয়ে আসে সান্টাবুড়োকে।  সান্টাক্লজ উপহার বিলোতে বিলোতে ক্লান্ত হয়ে কোক খাচ্ছে। ছবিটি এঁকে ছিলেন ফ্রেড মিজেন। সেই শুরু, এরপর ফি বছর ডিসেম্বর মাসে বুড়ো উপহার নিয়ে আসেন।
১) তথ্য বলছে ক্রিসমাসের দু’ সপ্তাহ আগে সব থেকে বেশি ব্রেকআপ হয়
ডেইলি মেল নামক একটি প্রখ্যাত ওয়েবসাইট জানিয়েছে যে  যে ক্রিসমাসের দু’সপ্তাহ আগে  ব্রেকাপের হার সর্বাধিক। যদিও ক্রিস্টমাসের দিন এই সংখ্যাটা নগণ্য। ম্যাক ক্যান্ডলেস ১০,০০০ ফেসবুক আপডেট স্ট্যাটাস নিরীক্ষা করে এই রিলেশন ব্রেকআপ গ্রাফ প্রকাশ করেছে এ বছর আগস্ট মাসে।



Sunday, December 20, 2015

ভাঙা প্রবন্ধ- কামতাপুরের ধরলা নদী



কামতাপুরের ধরলা নদী আর ছেলেবেলার মেঘ
 ( ‘লেখালেখি’ পত্রিকায় প্রকাশিত  ‘কামতাপুরের রাজপাটঃ একটি বিস্মৃত রাজধানী’র প্রত্নখনন’ শীর্ষক প্রবন্ধের অংশবিশেষ) 

বর্ষার সময় আমাদের উত্তরবঙ্গের গ্রামগুলো গাঢ় সবুজ হয়ে যায়। কালচে মেঘের ছায়া পড়ে পুকুরের জলে। মাঝে মাঝে আকাশের গোঙরানি আর চপচপে হিউমাস কাদায় চপর চপর শব্দ আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। এরপর অবিরাম ধারাপাত। মানকচুর ছাতা মাথায় আড়ষ্ট পায়ে ছুটে চলে মাঠ ফেরত কিশোরী...। ক্রমশ বৃষ্টি ধারায় ঢেকে যায় সবকিছু। খড়ের ছাউনি চুইয়ে বৃষ্টি ঝরে ঝরে পড়ে। ভেসে আসে গরুর ডাক। তোর্সা পারের বিস্তীর্ণ সমভূমিতে এসময় ধানের বীজ ফুঁড়ে সবুজ প্যাস্টেল ঘষা নির্মলতা।তবুও এই রঙ আর নির্মলতায় একটা বেদনার সুর ভেসে আসে। শট ট্রানসাকশন হয়। মেঘের ফাঁকে ফাঁকে অপার্থিব আলো।তবুও মায়ের কান্নার মত অজস্র বারিপতন...। 
বন্যার আশংকা আর স্যাঁতস্যাঁতে অ্যাজোলা মাড়িয়ে ধান ক্ষেতে কাজ করে হারান মিঞা আর রুনু বর্মণ। ফোলা চোখে চেয়ে থাকে চাষির পো।তার ফোলা চোখ, চ্যাপ্টা ঠোঁটে লেগে থাকে বৃষ্টিবিন্দু।চারদিক কেমন ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে ওঠে।বৃষ্টি সিক্ত অজস্র এলোমেলো বাতাস এই দিগন্ত বিস্তৃত ক্যানভাসের হলদেটে সান্দ্র রঙ শুষে নিতে পারেনা। তার ফোলা চোখের অবাক দৃষ্টি আর মেঘ ভাঙা আলোয় ধানক্ষেতের মান্তাজে ধরা দেয় সত্যজিতের নিশ্চিন্দিপুর। কেন, কীভাবে জানিনা। রবিশঙ্করের সুরে বাজতে থাকা বাঁশীর মত বুক দোমড়ানো সুরে রিক্সাওয়ালা গেয়ে ওঠে কামতাপুরের আদি সঙ্গীত-
ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দেরে
উড়িয়া যায়রে চকোয়ারে পংখী
বগীক বলে ঠারে
ওরে তোমার বগা বন্দী হইছে ধল্লা নদীর পারে রে

ভাওইয়া গানে এভাবেই ফিরে ফিরে আসে জল-জমি-জঙ্গলের কথা। এ গানেও একটা নদীর নাম আছে- ‘ধল্লা’। এই ‘ধল্লা’ নদী বোধহয় ‘ধরলা’ নদী।‘ধরলা’ নদীর কথা পাওয়া যায় ডাঃ বুকানন হ্যামিলটন সাহেবের কামতাপুর ভ্রমণের কাহিনীতে। সেটা ১৮০৯-১০ সাল।তথ্য বলছে, সে সময় কামতেশ্বর রাজার রাজধানীর পূর্ব দিকে ছিল ‘ধরলা’ নদী।কামতাপুরের উত্তর-দক্ষিণ-পশ্চিম জুড়ে বিদ্যমান ছিল বিশাল মাটির গড়। ধরলা নদী শত্রুপক্ষের আক্রমণ থেকে এই রাজপাট রক্ষা করত। এ প্রসঙ্গেও উপযুক্ত তথ্যাদি রয়েছে। যাইহোক, সে আর এক ইতিহাস। তবে ‘ধরলা’ নদীর বর্ণনা করতে গিয়ে হ্যামিলটন সাহেব ‘বিশাল’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন ১*। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ‘ধরলা’ নামে যে নদীটি কামতাপুরের গড়ের কাছে প্রবাহমান- তা একটি শীর্ণকায়া উপনদী।কোন পূর্ণিমার রাতে একে রূপোলী ফিতে বলে ভ্রম হয়। আগেই বলা হয়েছে হ্যামিলটন সাহেবের বর্ণনা অনুযায়ী কামতেশ্বর রাজার রাজধানীর পূর্ব দিকে ছিল ‘ধরলা’ নদী।আমরা যে ‘ধরলা’ নদীর রেফারেন্স এখানে টানছি, তা গড়ের উত্তর দিকে প্রবাহমানএক্ষেত্রে দুটো হাইপোথিসিস দাঁড় করানো যায়- ১)হ্যামিলটন সাহেবের দেওয়া তথ্য ঠিক নয় অথবা ২) আমরা যে ‘ধরলা’ নদীকে কামতেশ্বর রাজার গড়ের রক্ষী বলে ধরে নিচ্ছি, তা আসলে ইতিহাসে বর্ণিত ‘ধরলা’ নদী নয়। এক্ষেত্রে আরও একটা প্রশ্নের উদ্রেক হয়ঃ তাহলে গোঁসানিমারির গড় কি কামতেশ্বর রাজার রাজধানী নয়? বলাবাহুল্য, উত্তরবঙ্গে ‘ধরলা’ নামে একাধিক নদী আছে।জলপাইগুড়ি জেলার উপকণ্ঠে অবস্থিত শহর ময়নাগুড়ি ১**। এই শহর গড়ে উঠেছে ‘জড়দা’ নদীর তীরে। এই নদীর গতিপথ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর একটি উপনদী রয়েছে যার নাম ‘ধরলা’। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ময়নাগুড়ির খুব কাছেই জল্পেশ্বরের মন্দির। এই মন্দিরের নাম অনুসারে এই জায়গাটির নাম হয়েছে ‘জল্পেশ’ ১***।‘জড়দা’ নদী এই জনপদের পাশ দিয়ে বয়ে কোচবিহার জেলার চ্যাংড়াবান্ধার কাছে এসে ‘ধরলা’ নামে প্রবাহিত হয়েছে। এরপর এই নদী বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মানসাইয়ের সাথে মিশেছে। এই মানসাই আসলে জলঢাকা। এই নদীর সাথে ব্রহ্মপুত্র নদের একটা যোগ পাওয়া যায়। শোভেন সান্যাল তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কোচবিহার কিছু কথা কিছু ইতিহাস’-এ এই ধাঁধার সমাধান করেছেন-
‘বর্তমানের ধরলা এবং সিঙ্গিমারি নদীর সঙ্গে ডাঃহ্যামিলটনের বিবরণের যথেষ্ট তফাত থেকে যাচ্ছে। এই তফাতের একটাই কারণ উত্তরবঙ্গের নদীগুলির ঘনঘন দিক পরিবর্তন।এখন নানারকম সংরক্ষণমূলক বাঁধ প্রভৃতি দেওয়ার ফলে নদীগুলির মোটামুটি একটা স্থায়ী গতিপথ আছে। কিন্তু কয়েকশো বছর আগে এসব কিছুই ছিল না।ফলে প্রতিটি বন্যাতেই নদীর গতিপথের পরিবর্তন ঘটত। ধরলা নদীর গতিপথ নিয়ে আলোচনা করতে গেলেও সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখা যাবে’।        
বৃষ্টি থেমে গেলে একটা মনমরা রোদ চোখ ভিজিয়ে দেয়।ধরলা নদীর তীরে ভেজাভেজা বালির ওপর জমা হয় শেষ বিকেলের আলো। শতশত বছর ধরে বর্ষাকালেই বদলেছে ধরলার গতিপথ। হয়তো কাকতালীয় হবে, কিন্তু ধরলা আবিষ্কারের দু’শ বছর পর আমিও এখানে এসেছি এই বর্ষাকালেই। হু হু করে বয়ে আসা বর্ষার বাতাসে দুলে দুলে ওঠে সুপুরি বনের সারি। তখনও দিনহাটা মফস্বলে ঘিঞ্জি শহুরে আবাস তৈরি হয়নি। সমস্ত দিন মেঘ কালো ছায়া ঢেকে দিত গোঁসানিমারি গড়ের বাঘ দুয়ার। মেঘের ফাটল চুইয়ে ঝরে পড়ত অপার্থিব আলোর রেণু। কোন মানুষের হেলদল নেই। পুরনো বটের মত নির্লিপ্ত ভঙ্গীতে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকত মাটির গড়ের শেষ চিহ্ন। চোখ ফোলা বুড়োরা তৈরি করত অজস্র কিংবদন্তী
তথ্যসূত্র নির্দেশঃ
১) কোচবিহার কিছু কথা কিছু ইতিহাস- শোভেন সান্যাল। (১*, ১**, ১***)
২) বিষয়ঃ কোচবিহার- কোচবিহারের ইতিহাস – ডঃ নৃপেন্দ্রনাথ পাল।