![]() |
| মদ্যপ লোকটা |
‘How agonized we are over how people die... how untroubled we are by how they live’
- P. Sainath
সারাদিনের ক্লান্তি শেষে বুড়ো বট গাছের তলায় বসে আছি আমরা। সূর্যের
নিদারুণ অভিঘাতকে উপেক্ষা করে ঠায় দাঁড়িয়ে বুড়ো বট গাছ। তার বিস্তৃত
ডালপালা আর পাতার ছায়ায় বসে জিরিয়ে নিচ্ছিলাম আমরা। সামনেই বিরকার গ্রামের
শীতলা মন্দির ।
পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলদা ব্লকের অন্তর্গত এই গ্রামে
‘লোধা’ উপজাতির বাস। ব্রিটিশ নৃতত্ত্ববীদরা এদের ‘Denotified Tribe’
(‘জন্মদাগী অপরাধ প্রবণ জাতি’)হিসেবে চিহ্নিতকরেছেন। এরা ‘প্রটো
অস্ট্রালয়েড’ শ্রেণীর অন্তর্গত। স্বাধীনতা উত্তরকালে অধ্যাপক প্রবোধ কুমার
ভৌমিক লোধাদের উপর গবেষণা শুরু করেন। ১৯৫৫ খ্রিস্টা
ব্দে অধ্যাপক ভৌমিক
‘বিদিশা’ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। মূলত লোধাদের পুনর্বাসন এবং সমাজের
মূলস্রোতের সাথে একাত্মীকরণই ছিল এই আশ্রম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য।২০১১’র শেষ
দিকে প্রথমবার ‘বিদিশা’য় গিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল ‘বিদিশা’কে ‘বেস ক্যাম্প’
হিসেবে ব্যবহার করে বিরকার গ্রামের ‘লোধা’দের আর্থ-সামাজিক জীবন যাপন
অধ্যয়ন করা।
শীতলা পূজা কখনই লোধাদের ধর্ম বা সংস্কৃতির অঙ্গ নয়।
তাহলে বিরকার গ্রামে শীতলা মন্দির কেন? এটা বোঝার জন্য কোন রকেট সায়েন্স
জানার দরকার নেই। বলা বাহুল্য, উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের প্রভাবেই এহেন
‘অ্যাকালচারেশন’। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, শীতলা পুজাই এ গ্রামের একমাত্র বড়
উৎসব।
![]() |
| বিদিশা আশ্রম |
বট গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম,
মন্দিরের কাছেই হাড়িয়া বিক্রি হচ্ছে। অনেকক্ষন ধরে এক মাতালকে লক্ষ্য
করছিলাম। লোকটা উদ্ভ্রান্তের মত দৌড়চ্ছে আর চিৎকার করছে। কুচকুচে কালো
শরীরে কাদা মাখা। মাথা ভর্তি ঝাঁকরা চুল। পরনে শতচ্ছিন্ন প্যান্ট, কোমরের
সাথে দড়ি দিয়ে বাঁধা।
মদ্যপ মানুষটি বারবার তেড়ে যাচ্ছে একজন মহিলার দিকে। বোধহয় লোকটার স্ত্রী।
মদ্যপ মানুষটি বারবার তেড়ে যাচ্ছে একজন মহিলার দিকে। বোধহয় লোকটার স্ত্রী।
দেবা বলে উঠল, ‘সোশাল প্রবলেম’!
আমি মানসকে বললাম, ‘ক্যামেরার জুমটা বাড়া। জলসা বাকি আছে...’
এবার লোকটা ছুটে এল দেবা’র দিকে। শুরু হল অসংলগ্ন আত্মপ্রলাপ। আমরা এ হেন জলসা ক্যামেরাবন্দী করছি। লোকটা টলতে টলতে আমাদের কাছে উপস্থিত। আমরা প্রমাদ গুনলাম।
ধপ করে মাটিতে বসে বোকার মত হেসে ওঠে লোকটা। এরপর হাতজোড় করে কাঁদতে লাগল, ‘ হাসবেন না ছ্যার, বুকে নাগে’। কতকটা আত্মকথনের মত বিড়বিড় করছিল - ‘কত ছ্যার এল ... কিছু হবেক লাই’। এরপরের কথাগুলো আর বোঝা যায় না। হটাৎ চিৎকার করে উঠল-‘ ডাকুন পুলিসকে আমাদের ধরে লিয়ে যাক। খাওয়া লাই, আলো লাই, পয়সা লাই... পয়সা। ডাকুন পুলিসকে’।
তথাগত জবাব দেয়, ‘পয়সা না থাকলে পুলিস ধরে না, বদমায়েশি করলে ধরে’। কে শোনে কার কথা! লোকটি বিড়বিড় করে যাচ্ছে তখনও- ‘ডাকুন পুলিসকে...’
এরপর স্থানীয় কিছু যুবক লোকটিকে সরিয়ে নিয়ে যায়। আমাদের আশ্বস্ত করে বলে, ‘হারামি শালা ! কাজ বাজ নেই মাল খেয়ে খালি চিল্লাহল্লা করে’।
আমি মানসকে বললাম, ‘ক্যামেরার জুমটা বাড়া। জলসা বাকি আছে...’
এবার লোকটা ছুটে এল দেবা’র দিকে। শুরু হল অসংলগ্ন আত্মপ্রলাপ। আমরা এ হেন জলসা ক্যামেরাবন্দী করছি। লোকটা টলতে টলতে আমাদের কাছে উপস্থিত। আমরা প্রমাদ গুনলাম।
ধপ করে মাটিতে বসে বোকার মত হেসে ওঠে লোকটা। এরপর হাতজোড় করে কাঁদতে লাগল, ‘ হাসবেন না ছ্যার, বুকে নাগে’। কতকটা আত্মকথনের মত বিড়বিড় করছিল - ‘কত ছ্যার এল ... কিছু হবেক লাই’। এরপরের কথাগুলো আর বোঝা যায় না। হটাৎ চিৎকার করে উঠল-‘ ডাকুন পুলিসকে আমাদের ধরে লিয়ে যাক। খাওয়া লাই, আলো লাই, পয়সা লাই... পয়সা। ডাকুন পুলিসকে’।
তথাগত জবাব দেয়, ‘পয়সা না থাকলে পুলিস ধরে না, বদমায়েশি করলে ধরে’। কে শোনে কার কথা! লোকটি বিড়বিড় করে যাচ্ছে তখনও- ‘ডাকুন পুলিসকে...’
এরপর স্থানীয় কিছু যুবক লোকটিকে সরিয়ে নিয়ে যায়। আমাদের আশ্বস্ত করে বলে, ‘হারামি শালা ! কাজ বাজ নেই মাল খেয়ে খালি চিল্লাহল্লা করে’।
![]() |
| বিরকারের ঘরদোর |
এর মাঝে পূর্ণাভ দা’র ফোন, ‘কোথায় তোরা? এ ডি স্যার ডাকছেন’।
স্বাধীনতার পর ছয় দশকের বেশি সময় অতিক্রান্ত। তবু বিরকার পড়ে আছে মধ্যযুগীয় অন্ধকারে। অনাহার হয়ত নেই কিন্তু অপুষ্টি আছে। গভীর ভাবে মিশে আছে এদের শরীরে মনে। লিকলিকে হাত পা আর পেট মোটা শিশুর দল ঝাপসা চোখে চেয়ে থাকে। সুষম খাদ্যের হিসেব যেন ক্ষুন্নিবৃত্তির মিথ্যা মরীচিকা। প্রখ্যাত সাংবাদিক, গবেষক পি- সাইনাথ তাঁর ‘Everybody loves a good drought’ গ্রন্থের সূচনায় এই পরিস্থিতিকে ব্যখ্যা করেছেন সুনিপুণ ভাবে- ‘দিনে ২৪০০ কিম্বা ২১০০ ক্যালোরির আবশ্যিক খাদ্য পেয়েও দারিদ্র্যের তলানিতে থাকা যায়। সংকটদীর্ণ সোমালিয়া অথবা ইথিওপিয়ার চাইতে ভারতের সমস্যাটা সম্পূর্ণ ভিন্নতর। ক্ষুধা দারিদ্র্যের একটা দিক – এখানে তার চেহারাও অনেক বেশি জটিল।
![]() |
| বিদিশা আশ্রমের হরিণ |
এগারোটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা
রূপায়ন এবং বারো নম্বরের বাড়াবাড়ি রকমের আদিখ্যেতা’র সমান্তরালে বিরকারের
মত গ্রামগুলি আজও বিদ্যুৎ ব্যবস্থারহিত, মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকের শেষ লাইনে
দাঁড়িয়ে আছে। এ গ্রামের বেশিরভাগ শিশুরই এখন ‘প্রথম প্রজন্ম শিক্ষা’ (
First generation education) চলছে। চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীরা বাবা
মায়ের নামটুকু বলতে পারে না, লেখা তো দূরের কথা!
![]() |
| আমরা যারা গাছের তলায় বসেছিলাম... |
২০০৫ সালে বিশ্ব
ব্যাংক জানিয়েছিল, ভারতের মোট জনসংখ্যার ৪১.৬% আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য
সীমারেখার নীচে বাস করে ( অর্থাৎ ৪২ কোটির উপর ভারতীয় দিনে ১.২১ মার্কিন
ডলার আয় করতে অক্ষম)। Oxford Poverty and Human Initiative- এর দেওয়া তথ্য
আরও ভয়ানক। এদেশে আটটি এমন রাজ্য আছে, যাদের গরীব জনসংখ্যার সমষ্টি আফ্রিকা
মহাদেশের ২৬ টি গরীবতম দেশের গরীব জনসমষ্টির থেকেও বেশি। অর্থাৎ সংখ্যাটা
দাঁড়াচ্ছে ৩২ কোটিরও বেশি। UNICEF জানাচ্ছে, সারা বিশ্বের প্রতি তিনজন
অপুষ্ট শিশুর একজন ভারতীয়। National Commission for Enterprises in the
Unorganized Sector, 2007 – এর রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতবর্ষের মোট জনসংখ্যার
৭৭% (অর্থাৎ ৮৩.৬ কোটি) মানুষ বেঁচে থাকে ২০ টাকার কম প্রাত্যহিক খরচের উপর
ভিত্তি করে। বিশ্বব্যাংক এর ভাষায়- ‘About 49 percent of world’s
underweight children, 34% of the world’s stunted children and 49% of
world’s wasted children, live in India’
কিন্তু পরিসংখ্যান বা ‘ডেটা’ কখনই দুঃখ কষ্টের পরিধিকে বিধৃত করে না, এ হেন সংখ্যার ভিড় বড়জোর দরজায় কড়া নাড়তে পারে। ঘরের ভেতরটাকে উপলব্ধি করতে হলে দরকার সহমর্মিতা। আবার দরজায় কড়া নাড়ার বিষয়টাও বিশুদ্ধ নয়। অনেক সময়ই ভুল দরজায় কড়া নাড়া হয়। বিগত দিনে মাঠে ঘাটে ‘ডেটার ডাটা চচ্চড়ি’ ব্যাপারটা প্রত্যক্ষ করেছি ভাল ভাবেই!!!!!!!!!!!!!!
কিন্তু পরিসংখ্যান বা ‘ডেটা’ কখনই দুঃখ কষ্টের পরিধিকে বিধৃত করে না, এ হেন সংখ্যার ভিড় বড়জোর দরজায় কড়া নাড়তে পারে। ঘরের ভেতরটাকে উপলব্ধি করতে হলে দরকার সহমর্মিতা। আবার দরজায় কড়া নাড়ার বিষয়টাও বিশুদ্ধ নয়। অনেক সময়ই ভুল দরজায় কড়া নাড়া হয়। বিগত দিনে মাঠে ঘাটে ‘ডেটার ডাটা চচ্চড়ি’ ব্যাপারটা প্রত্যক্ষ করেছি ভাল ভাবেই!!!!!!!!!!!!!!
পুনশ্চঃ জাতে মাতাল তালে ঠিক।





No comments:
Post a Comment