মুরগাতল পাহাড়ের মেঘ
রাঁচি’র আকাশে গুমোট মেঘ দানা বেঁধেছে। ধূপের ধোঁয়ার মত মেঘ জড়ো হচ্ছে মুরগাতল পাহাড়ের
মাথায়। আমি জানলা থেকে স্পষ্ট দেখতে পাই। মেঘের ভাজে ভাজে ঘোলাটে ঘূর্ণির মত আলো উঁকি
দিচ্ছে। আমি জানি এ মেঘে বৃষ্টি হয়না। একটা গল্প মনে পড়ে যাচ্ছে। অবিকল এই মেঘলা দিনের
গল্প। সেবার চাষের মাসে বৃষ্টি হয়নি। সহদেব বেদিয়া মহুয়াটুংরিতে থাকে।দুই একর জমি, তার মধ্যে এক একর টাঁড়।টাঁড়ে চাষবাস হয়না। দোনে যেটুকু জমি আছে, তাতে একবার ধান হয়। কিছু জমিতে মাড়ুয়া আর ঘরের আশেপাশের জমিতে, জংলায় লতানে পাতা- সবজি চাষ হয়। দোনে মাঝে মাঝে বিলাতি টম্যাটো লাগায়। টম্যাটো পোড়া দিয়ে ভাত আর হাড়িয়া- এই ছিল সহদেবের জীবন। ও হ্যাঁ একটা বুড্ঢি মা আছে।
যেবারের কথা বলছিলাম, সেবার বৃষ্টি হয়নি।হাড়িয়া খাবার পয়সা নেই।পেশা ছুটলেও নেশা ছোটে না। সহদেব অন্যদিনের মতই ধারে মাল খেতে গিয়েছিল। সেখানেই কাজের সন্ধান দিল রাবু। রাবু নিজেও একই কাজ করে।
পরদিন সূর্য ওঠার আগেই সহদেব আর রাবু ট্রেকারে উঠে পড়ল। প্রথমবার খাঁচায় এলে মুরাগারা যেভাবে ভাবলেশহীন মুখে চেয়ে থাকে, সেভাবে সহদেবও রাবু’র দিকে চেয়েছিল। আশেপাশের গ্রাম থেকে লোকজন ভিড় করেছে। গাড়ি থামল মোরাবাদি ময়দানের কাছে। হুড়মুড় করে ভিড়টা নেমে গেল রাস্তায়। কাজের আশায় সকলে দাঁড়িয়ে আছে। সারি সারি কুসুম গাছের বাগান যেন। শহুরে বাবুরা এসে লেবার পছন্দ করে নিয়ে যাচ্ছে। সহদেবের ভাগ্যটাই খারাপ। বেলা ন’টা। এখনও সে বিক্রি হয়নি। শেষে দেড়শ টাকা রেটে নিজেকে বেঁচে দিল বাড়ি তৈরির ঠিকাদারের কাছে।
মুরগাতল পাহাড়ের তলায় নতুন ফ্ল্যাটবাড়ি তৈরি হচ্ছে। অনেক লেবার দরকার। সহদেব তার মা’কে নিয়ে এল। বুড়ীর এখনও তাকত আছে। বৃষ্টি আসার নাম নেই। এভাবে দিনকয়েক চলছিল। হটাৎ আকাশে মেঘ করল। সহদেব তখন বাঁশের মাচায় চেপে সিমেন্ট জোগানোর কাজ করছে। মেঘের দিকে চেয়ে কেমন আনন্দ হল। আবার মিলিয়ে যায় সবকিছু।এখন ঘরে ফেরা যাবে না। মাঠ ভিজে যাবে, আগাছারা বেড়ে উঠবে, তবু সহদেব যেতে পারবে না। কী হবে ধানের বীজ আর পবিত্র বীজতলার?
কিছুই হয়নি। রক্তারক্তি কান্ড। অন্যমনস্ক সহদেব উঁচু মাচা থেকে সোজা পাথরে পড়েছে। দেহটা তখনও ছটফট করছে। ভেসে যাওয়া লাল স্রোতে দু’ ফোঁটা জল। ডুকরে উঠল মা।আঁসু নয়, আকাশের জল পড়েছে সহদেবের রক্তের স্রোতে। আলুথালু চুলে বুড়ী অজস্র অভিসম্পাত বর্ষণ করতে শুরু করেছে। ততক্ষণে সারনা’র পবিত্র জঙ্গলে, শাল বনের ছায়ায় উচ্চারিত হচ্ছে আদিম ডাইন বিদ্যার সব অলৌকিক মন্ত্র। জেগে উঠলেন মারাং বুরু। বুড়ী অবিরাম বিড়বিড় করে চলেছে। অপলক দৃষ্টি মেঘের দিকে। বুড়ীর চোখে জমা হয়েছে দশ হাজার বছরের জিঘাংসার মেঘ। দশ হাজার বছর, আমাদের চাষের।
এরপর এতগুলো বছর পেরিয়েও বুড়ী ডান বেঁচে আছে মুরগাতল পাহাড়ে। ক্রমে সহদেবের রক্ত মিশেছে মাটির লালে।মুরগাতল পাহাড়ের পায়ের কাছে গড়ে উঠেছে রঙিন আবাসন। বেড়ে উঠছে রাঁচি। শহরের আকাশ কালো করে মেঘ জমে। সারা শহর ভেসে যায় বৃষ্টি ধারায়।কিন্তু মুরগাতল পাহাড় ভেজে না। মেঘের ছায়া পড়ে পাহাড়ে। তখনই মেঘের ভাজে ভাজে ঘোলাটে ঘূর্ণির মত আলো উঁকি দেয়। পাহাড় ভেজে না। এই উষরতায় কোন ঘাস-লতাও জন্মায় না। জন্মায় শুধু কংক্রিটের আগাছা।