Content

Wednesday, October 15, 2014

এভিয়ান হারাকিরিঃ কয়েকটি পাখির আত্মহনন বৃত্তান্ত


এভিয়ান হারাকিরিঃ কয়েকটি পাখির আত্মহনন বৃত্তান্ত   

 ছবিটি আঁকা হয়েছে অ্যাক্রেলিক রঙে
অলংকরণ- শ্রী শাম্ব

জাটিঙ্গা গ্রামে পৌঁছুলাম বিকেল চারটে নাগাদ। বর্ষা শেষে এদিকের জঙ্গল-পাহাড় টকটকে সবুজ। নাকে ভেসে আসছে তীব্র বনজ গন্ধ। একটা সরু হাওয়ার প্রলেপ লেগে গেল পুলওভারে। এখন সেপ্টেম্বরের শেষ। এদিকটায় সবে ঠাণ্ডা পড়েছে।
এই গ্রামটার কথা প্রথম শুনেছিলাম অমলকান্তির কাছে। অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি, কিন্তু ছুঁয়ে গেছে রোদ্দুরের পৃথিবী, ঘামের পৃথিবী, রাতের পৃথিবী, দিনের পৃথিবী, মাটির পৃথিবীকে। ঘুরে বেড়িয়েছে ভারতবর্ষের এ গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে। ওর সাথে আমার আলাপ হয়েছিল রাজস্থানের রামদেওড়াতে। স্টেশনের বাইরে কয়েকটা পাখির মৃত দেহ দেখে বলেছিল, ‘এভিয়ান হারাকিরি
-
মানে?
-
অবিকল একই ঘটনা। আত্মহনন।
পাখিগুলো আগুনে ঝলসে গেছে। পাশেই ধিকিধিকি আগুন এখনও জ্বলছে। কয়েকটা ডালপালা জড়ো করে কে বা কারা যেন আগুন তাপিয়েছে। কিন্তু পাখিরা কি আত্মহত্যা করে? প্রেইং মেন্টিস আর কিছু

পোকামাকড় মিলনের সময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে- এটা শুনেছি। এক্কেবারে অন্য বিষয়। মানুষ ছাড়া এভাবে আর কোন প্রাণী ভাবতে পারে বলে মনে হয়না। আত্মহত্যার জন্যও তো কিছু ভাবনা জরুরী। মানুষ ছাড়া আর কোন প্রাণী আত্মহত্যা করে বলে তো জানা নেই।
-
অবশ্যই করে। জাটিঙ্গা গ্রামে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত পাখিরা আত্মহত্যা করে। যখন আকাশে চাঁদ থাকেনা...
-
জাটিঙ্গা গ্রাম?
-
হুম। অসমের ডিমা হাসও জেলার একটা ছোট্ট গ্রাম...। আমি নিজে চোখে দেখেছি। বক, লিটল এগ্রেট, হ্যারন, পিট্টা, মাছরাঙ্গাআরও অনেক পাখি। সেলিম আলিও দেখেছিলেন।
সেলিম আলির নাম আমি আগে শুনেছি। বিখ্যাত পক্ষী বিশারদ।

এরপর অমলকান্তির মুখে শুনেছিলামঃ এই অদ্ভুত ঘটনা ঘটে কুয়াশা ঢাকা রাতে- যে রাতে চাঁদ ওঠেনা । প্রচণ্ড শীত থেকে বাঁচার জন্য মানুষ আগুন জ্বালায়। আর ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি এসে এই আগুনে জ্বলে পুড়ে মরে। অথচ এটা অস্বাভাবিক। এরা কেউ রাত জাগা পাখি নয়। ওরনিথোলজিস্টরা বলেছেন, এসময় এই এলাকায় আবহাওয়া এবং ভূগর্ভস্থ জলে পরিবর্তন আসে, হয়ত এই পরিবর্তন পাখিদের কাম্য নয়। আতঙ্কিত হয়ে এরপর আত্মহত্যা করে। কিন্তু এ ব্যখ্যা সম্পর্কে তাঁরাও সন্দিহান। সেলিম আলি এর জন্য দায়ী করেছেনউচ্চতা, কুয়াশা আর ট্রমা’ –এসব ফ্যাক্টরকে।
অমলকান্তি এসব বিশ্বাস করেনা। ওর ধারণা, গোটা ব্যাপারটাই মনস্তাত্ত্বিক। আসলে মানুষের মত পাখিদেরও চাওয়া পাওয়া আছে। প্রথম যে পাখিটি আত্মহত্যা করেছিল, সে মৃত্যুর আগে আত্মহত্যার কারণ জানিয়ে গিয়েছিল আরেকজনকে। এভাবে বিষয়টা অন্যদের কানে পৌঁছনোর পর অনেকেই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। সব পাপ ধুয়ে ফেলতে চায়। এরপর ব্যাপারটা গণহিস্টিরিয়ার আকার নেয়। সেটা ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ। সেবারই প্রথম আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছিল। ওদের অজান্তেই একশ বছর ধরে এই ঘটনা চলতে থাকে। এখন বোধহয় এটা একটা ট্র্যাডিশন ওদের কাছে... ।
এসব সাতপাঁচ ভাবছিলাম।
এখানে সন্ধ্যা নামে ঝুপ করে। আকাশের জুড়ে কে যেন কুহেলী হিমানীর কাফন বিছিয়েছে। ধোঁয়া ধোঁয়া কুয়াশার গন্ধ নাকেমুখে লেগে আছে। এই দমবন্ধ কুয়াশার রাতে মৃদু ফিসফাস শোনা যায়।
একটা ধোঁয়ার রেখা দেখা যাচ্ছে । এটা কুয়াশা নয়। কারা যেন আগুন জ্বেলেছে। একটা মৃদু শব্দ শুনতে পাচ্ছি, ডানা ঝাপটানোর। আমার চোখের পাতায় ঘন কুয়াশা জমেছে বোধহয়। আমি তাকিয়ে থাকতে পারছি না। ক্রমশ চোখ মুদে আসছে। বেসুরো ডানা ঝাপটানোর শব্দ এখন কুয়াশার থেকেও ঘন। এবার সব পাপ আগুনে ধুয়ে মুছে সাফ হবে। জিব্রাইলের আগুনের পাখার উত্তাপ তিনি টের পাননি কোনদিন। আমি বেশ টের পাচ্ছি। হিস্টিরিয়া আক্রান্ত আমি এগিয়ে চলেছি আগুনের দিকে। বেশ টের পাচ্ছি...

 


No comments:

Post a Comment