Content

Tuesday, October 21, 2014

রাঁচি:একলা দিনের বর্ণমালা

অলংকরণ- শ্রী শাম্ব
বার জারি হয়েছে খরা'র ফরমান। রাঁচি সহ সমস্ত ছোটনাগপুর মালভূমি জুড়ে এখন ফুটিফাটা মাঠ আর জলহীন আকাশপট। হলদেটে দুপুরে চোখ মুদে আসে ক্লান্তিতে। কালো কালো বাচ্চাগুলো আম গাছে ঢেলা ছুঁড়ছে। পোকা খাওয়া আমের আঁটি মুখে ভেঁপু বাজায় বখাটে বিল্লু। তারপর সব তাপ নিভে গেলে বিকেলের শেষ ওমটুকু বুকে নিয়ে বুড়ো কৃষ্ণ বেদিয়া বাজায় একটা করুন সুর... শেষ ঘুড়ি তখনও আকাশে। চারপাশ কালো কালো অন্ধকারে ঢেকে যায়... বেহালা চুঁইয়ে শত শত বছরের বঞ্চনার বর্ণমালা ঝরে ঝরে পড়ে।ফাঁকা হয়ে আসা মাথার কোণায় একটা ব্যথা অনুভব করি... সমব্যথী?- তাহলে বুকের বাম দিকে কোন ব্যথা নেই কেন! - এভাবেই আঁকা হয় ছাইপাঁশ অথবা একলা দিনের বর্ণমালা।


 **************************************



এপ্রিল শেষে ৪৮ ডিগ্রীর ছ্যাঁকা সারা রাঁচি শহর জুড়ে। শীত শেষ হয়ে গেলে বাঙালী’র দল ছোটনাগপুর মালভূমি ফাঁকা করে ফিরে যায় কলকাতায়। তপ্ত দুপুর আর নধর কিছু আমগাছ দাঁড়িয়ে থাকে বাগান জুড়ে। এই বাগানগুলো অনেক পুরনো। ফুটিফাটা প্রাচীন বাগানবাড়িগুলো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে, আবার শীতের অপেক্ষা। শহরের উপপ্রান্তে বেশকিছু পলাশের বন তখন আগুনরাঙা - - পুরুলিয়ায় একটা ঝুমুর শুনেছিলাম, ‘পিদাড়ে পলাশের বন/ পলাব পলাব মন’।
টেগোর হিল: অলংকরণ- শ্রী শাম্ব
অনেকটা সেইরকম অনুভূতি হয়। এরপর তাপের পারদ চড়তে থাকে। অসহ্য রোদেলা দুপুরগুলো ঘুম ঘুম নেশার আবেশ তৈরি করে। ভুত-পেত্নির স্বপ্নে যেন আঁতকে উঠি, ঘুম ভেজা ঘর্মাক্ত কলেবর জানান দেয়- পাওয়ার কাট । স্নান শেষে শরীর সিক্ত হয়না। জলতল নীচে নেমে আসে। দু’চারটে বখাটে ছেলে পিং পং বল দিয়ে ক্রিকেট খেলছে বাড়ির ছাদে । আমি স্পষ্ট শুনতে পাই । এটা ধোনি’র শহর । শহরের মাঝে মাঝে গুটিকয় টিলা উঁকি দেয় । এই গরমে সকলে ন্যাড়া হয়েছে । আমার বারান্দা দিয়ে মুরগা-মুরগী তল পাহাড় দেখা যায়। তার তলায় প্রতিদিন বাড়তে থাকা শহরটাকে রক্তবীজের সন্তান মনে হয় । আর একটা পাহাড় দেখা যায় আমার জানলা দিয়ে, ‘টেগোর হিল’। এই পাহাড়টা বদলায় না । যে কোন রোববার আমি স্পষ্ট দেখতে পাই, দুপুর রোদে কারা যেন জড়াজড়ি করে বসে আছে । *******************************************************************************

ঝিরিঝিরি ঠাণ্ডা বাতাস মোরাবাদির শহুরে আবাসন পেরিয়ে মান্তি হোটেলের পেছনে একটা বড় গাছে ধাক্কা খায় যেন। টিপির টিপির বৃষ্টি এ সময় লেগেই থাকে। তিনখানা বুড়োভাম আর এক ঝাঁক ছানাপোনা তেকাঠি আর ক্যাম্বিস নিয়ে মাঠে নেমে পড়ে। এভাবেই চলে বর্ষা-যাপন।
কে জানে কার পাকা ধানে মই দিচ্ছে ওরা!
আশেপাশের লোকজন পরামর্শ করল নিজেদের মধ্যে। সারা মাঠ কুপিয়ে রেখে গেল এক স্বেচ্ছাসেবক।
এদিকে আকাশেরও মুখ ভার। সমস্ত দুপুর গাঢ় নীল আকাশের থেকে বিন্দু বিন্দু আলোর রেণু ঝরে পড়ছিল। সারা মাঠ যেন কেউ সবুজ প্যাস্টেল দিয়ে ঘষে দিয়েছে। চিটচিটে বৃষ্টি নামার আগে মেঘের ছায়া পড়েছে মুরগাতল পাহাড়ের গায়ে। সবকিছু ছাপিয়ে ‘মেঘের পরে মেঘ জমেছে’। অবিকল রবি ঠাকুরের গানের মতো। হ্যান্ডমেড পেপারে নীল রং ছড়ানো যে মেঘের ছবি আমাদের বড্ড পরিচিত- হুবহু একই দৃশ্য।
ঝলমলে আলো ঢেকে গিয়ে কীভাবে যেন ছবির বইয়ের জলরঙে আঁকা ল্যান্ডস্কেপ হয়ে উঠল ‘সুমনের দোকানের পেছন দিকের মাঠ’...

অক্টোবর, ২০১৩


শীতের সকালে মনমরা আলো ফুটেছে সদ্য । রাঁচি শহরটা এমনিতেই ঘুমকাতুরে । সকাল ন’টা  নাগাদ চোখ কচলে জেগে ওঠে । আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে দশটা বেজে যায় । এইসব ফিডব্যাক আগেই সংগ্রহ করেছিলাম । কাটাটোলি মোড়ে সদ্য ঝাঁপ খুলেছে বেহারী পানওয়ালা । হটা চোখ কচলে দেখি বাংলায় লেখা পোস্টার – ‘ঝাড়খণ্ডের দ্বিতীয় ভাষার মর্যাদা দিতে হবে বাংলাকে’। লালপুরে বাঙালী আবাস আছে জানা ছিল, তবে এই পোস্টারটা একেবারে আনএক্সপেকটেড । শিবরাম চক্কোত্তি’র গপ্পে লালপুরের রেফারেন্স পাওয়া যায় । এসব হাবিজাবি পেরিয়ে করমটোলি চকে এসে যখন পছুঁলাম, তখন ঝলমলে শীতের রোদ আর শহুরে অটোর দাপাদাপি । আবার অটো ভাড়া করতে হবে । সারনা পরব চলছে এখন । তাই অটো কম । এরকম সিচুয়েশনে খুব রাগ ওঠে । বারবার নিজের শহরের রেফারেন্স টানতে ইচ্ছে করে । শীর্ষেন্দু’র একটা লেখায় পড়েছিলাম, ‘একদিকে প্রিয়জন আর উলটোপাশে প্রয়োজন’ !
মা পূজা'র নাচ

ভাড় মে যায়ে রিসার্চ ওয়ার্ক !
 কিন্তু একটা শহর যে কখন একজন অপরিচিত আগন্তুকের বুকে নিঃসাড়ে উঁকি দেয়, তা কে বলতে পারে । হটাত ধামসা মদলের নিনাদে চোখ কান খাড়া হয়ে যায় । এই শব্দ আমার বহু পরিচিত । শাল ফুলের মালা আর করম ফুলের টোপর শোভিত আদিবাসী রমণীরা রাস্তা পার হচ্ছে । রেডল্যাটেরাইট মাটির এই ঘ্রাণ অনেকদিন জমে আছে আমার নাকেএকটা  আস্ত শহরকে গ্রাস করেছে গেয়ো মাটির ঘ্রাণ । আমি দাঁড়িয়ে থাকি ঝালদা, জঙ্গলমহল আর বেলপাহাড়িয়ার আশ্চর্য পরিচিত ভালোলাগায়, ভালোবাসায় । ঠিক যেন ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’ এর মান্তাজ । অজস্র সাদাকালো ছবি ভিড় করে এই ‘কলকাতা’র স্যাটেলাইট’ শহরে ।  সেই প্রথম ভালোলাগা । লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইড !

No comments:

Post a Comment