অনেকদিন এভাবে কোন বাংলা বই শুরু হয়নি – ‘সূর্য উঠার আগেই হৈ হৈ করে সবাই
উঠে পড়ল । পরনে এখনও যুদ্ধের পোশাক। যুদ্ধ শেষ । এবার বাড়ি ফেরার পালা ।
কোন বাড়ি? ঝিলের পাড়ে সারি সারি কবর । বীর যোদ্ধাদের কবর । এই তো তাদের
বাড়ি । কিন্তু কোথায় আমার বাড়ি?’ কিছু গুমোট বাতাস, বারুদের নির্জাস,
আত্মকথনের মত অজস্র অনুভূতি, বিশ্বাস, জীবন আর চিরায়ত চেতনার সংঘাত – এসব
কিছু জড়ো হয়েছে হুমায়ূন কবিরের গ্রন্থ ‘ তীর্থযাত্রী তিনজন তার্কিক’-এ।
তিনজন মানুষ তীর্থের অন্বেষণে ব্যাপৃত । প্যারালাল কনটেক্সটে ক্রমশ গাঢ়
হয়ে ওঠে তিন দশকের যুদ্ধ শেষের দীর্ঘশ্বাস- ‘কাঙ্ক্ষিত এ বিজয় আমার প্রাপ্য
নয়/ প্রাপ্ত এ বিজয় আমার কাঙ্ক্ষিত নয়’। পাহাড়ের মেটামরফিক পাথর চুঁইয়ে
যেমন জল গড়ায়, সেভাবে জড়ো হয় ‘জীর্ণ ফলকে ধুলোর ছাপ’।কোন প্যাটার্ন না মেনে
মুক্ত গদ্যের প্রগলভতা আর উপন্যাসের চরিত্র বিন্যাস ভিড় করে একশ দুই পাতার
পেপার ব্যাকে। কোন চরিত্রই দীর্ঘস্থায়ী হয়না, ফলে কোন স্পষ্ট অবয়ব তৈরি
হয়না। যেটা তৈরি হয়, তাকে সহজ ভাষায় বোধহয় ‘উপলব্ধি’ বলে। সিপিয়া টিউনে
আঁকা কতগুলো যুদ্ধের দৃশ্য তৈরি হয় । সেটা রণক্ষেত্র নয়, জীবনযুদ্ধ । লেখার
শুরুতেই এর নিশান আছে, প্রাজ্ঞ সেনাপতি অভিবাদনের স্বরে দিক নির্দেশ করেন-
‘এবার আসল যুদ্ধ শুরু তোমাদের/ বাকিটা জীবন কাটাবে সেই যুদ্ধে যেখানে নেই
কোনও বিজয়ী বীর’। এই নির্লিপ্ততা থকেই কি তিনজন খুঁজে ফেরে তীর্থক্ষেত্র ?
তর্কটা কি নিয়ে ? – এটা কি আদৌ নির্লিপ্ততা না চূড়ান্ত গৃহী জীবনে অতিষ্ঠ
হয়ে বানপ্রস্থ। এত দার্শনিক উচ্চারণ একটা ধন্দ তৈরি হয়। এটাই হয়তো আমরা
গোটা জীবন বয়ে বেড়াই । এই বিবর্ণ – বিমর্ষ- নিরানন্দ/ সকাল- বিকেল- রাত ...
এসব কিছু অতিক্রম করে একটা অবকাশ খোঁজার চেষ্টা- এটাই কি গন্তব্য? অথবা
তীর্থক্ষেত্র? ‘তিনজন গৃহহারা। ঘর নেই। সংসার নেই। যুদ্ধ নেই। কেমন জীবন?
অফুরন্ত অবসর। শুয়ে শুয়ে আকাশে চোখ রাখো’।‘হরিদ্রাগ্রামের মাঠে হেমন্তের অশ্বত্থ ছায়া’ পেরিয়ে হেঁটে চলেন তিন তার্কিক। সাথে জড়ো হয় গুরুজি, ভক্ত আর অজস্র সংলাপের অনুরণন। তৈরি হয় খণ্ড খণ্ড তর্কের উপাদান। অন্ধবৃদ্ধ ধুলোয় বসে পাখির সাথে কথা বলেন। বাম হাত কেন লাল? কাঁপানো সুরের গজল – এসব খণ্ডচিত্র একটা মান্তাজ তৈরি করে । কতগুলো তর্কের বীজ বপন করে। ইরাবতী নদীর তীর ঘেঁষে বড় রাস্তার দুপাশে কৃষ্ণচূড়া, গেরুয়া ফকির আর আলতামিরা গুহা- এসবকিছুকে ছাপিয়ে এক বৃদ্ধের খোঁজ মেলে যে গুহাচিত্র এঁকে বেড়ায়। এহেন চরিত্ররা অনেকদিন বাংলা ভাষায় আসে নি। আমাদের সাথে বাড়তে থাকা এক ছায়াবন্ধু’র কথা উঠে আসে...এখানে তর্কের অবকাশ আছে । সংবেদনশীল পাঠক আয়নায় মুখ দেখেন।
মাঝে মাঝে কিছু উপলব্ধি উঁকি দেয়, কিন্তু কোন ডেফিনিট আইডেন্টিটি অথবা টপোগ্রাফি তৈরি করে না। অর্থাৎ কোন পথনির্দেশ নেই। একটা অন্বেষণ যেটা টেন্ডস টু ইনফিনিটি – এরকম মনে হতে পারেঃ ‘ হৃদয় এখন মেঘের মতোই নির্মল... আগামী ভোরে শুরু হবে জ্ঞানের প্রথম পাঠ। তীর্থযাত্রী পথচারী আমরা এখনও পৃথিবীর পথে পথে। কে জানে এর শেষ কই। কোথায় লুকিয়ে আছে তীর্থস্থান?’
তবে আপাত সত্যটা কি শাশ্বত? কে জানে- মননশীল পাঠক হয়তো নিজেই একটা রূপরেখা তৈরি করবেন। সুখপাঠ্য এই বইকে নন্দিত বা নিন্দিত করা বোধহয় শ্রেয় হবে না, বরং বলতে পারি- চেতনা আর চিন্তনের এই টেক্সটকে একবার হাতে নিয়ে দেখুন। কে জানে ক্ষ্যাপা খুঁজে পেতে পারে পরশপাথর ।
বিপাশা হায়েৎ কৃত অনবদ্য প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ চোখ টানতে বাধ্য। প্রচ্ছদ জুড়ে অওারমিফাই সিফিয়া টিউনে একটা গুহাচিত্র, যেখানে তিনজন তীর্থযাত্রী হেঁটে চলেছেন। কারো হাত কেউ ধরেননি। আকারেও ভিন্নতা। অতএব তর্ক বাঁধবেই। তবে প্রচ্ছদের ক্যালিগ্রাফিটা একটু অন্যরকম হলে বেশ হ’ত।
এই দারুন বইটা’র এপারবাংলা সংস্করণ প্রকাশের জন্য রোহণ কুদ্দুস তোমায় অজস্র ধন্যবাদ।
No comments:
Post a Comment