Content

Saturday, December 21, 2013

পুস্তক আলোচনাঃ কিরীটি সেনগুপ্ত'র 'আয় না'



কাকস্নানও জরুরী
 
যখন দুহাত তুলে নাচে তুমি বল বালখিল্য; আমি দেখি/ সমর্পণ।/ ওরা যে শিশু.../ মহাপ্রভু চৈতন্য নয়- কথামৃতও চৈতন্যময়
এই উচ্চারণ আত্ম-বিক্ষনের, সমর্পণের, তবুও অমোঘ নয়। সুস্থ দুচোখ থাকলেই দেখা সম্পূর্ণ হয় না, মুখ থাকলেও অনেকে মূক হয়। তবুও কেউ কেউ আছেন, যাঁরা দুচোখ মেলে দেখেন। মুখ ফুটে কথা বলতে জানেন। কিরীটী সেনগুপ্তের আয় নাসদ্য শেষ করে অন্তত একবারের জন্য এটা মনে হল।
Creative Non-Fictional Streaming বা সৃজনধর্মী মুক্ত-গদ্য লেখার একটা হিড়িক শুরু হয়েছে চারদিকে। কে বা কারা যেন যা ইচ্ছা তাইলিখতে গিয়ে যাচ্ছেতাইকাণ্ড বাঁধিয়ে ফেলছে। একটু ভয়ে ভয়েই বইটা খুলেছিলাম। এ ডুমা, এলব্যইয়র কামু হওয়ার দৌড়ে নাম লিখিয়েছে নব্য নেট-স্যাভি বাঙালী। সে লাইনে আবার একজন! বিশ্বাস করুন, ভয় অমূলক ছিল। এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম আয় না। একবারও মনে হয়নি, ধুর শালা!**-এর বই।
চার ফর্মার বই জুড়ে হিট অ্যান্ড রানপলিসি নিয়েছেন লেখক। মাঝে মাঝে তাই বড্ড গায়ে লাগে। নিজেদের ক্লাউন বলে মনে হয়। বলগাহীন প্রত্যয় কড়া নাড়ে আমাদের প্রতীতির দুয়ারে। দুয়ার আঁটা নির্জীব ঘরগুলোতে বিরামহীনভাবে কড়া নেড়ে কে যেন ডেকে যায়, ‘অবনী বাড়ি আছো!
খোদা ভদ্রলোক কি চান, বুঝে নিতে পারলাম না আজও। মনোপলির একচেটিয়া দৌড়ে অন্যে সামিল হলে ভালোলাগার কথা নয়। হা কৃষ্ণ, কোথা কৃষ্ণ করলেই কাছে ঘেঁষতে দেবেন, এমন ভেবে নেওয়ার মধ্যে কোনো ভক্তি আছে বলে মনে হয় না। আর যোগ তো দুরস্থান। কতবার নিজেকে বুঝিয়েছি, টপটপ করে চোখের জল ফেললেই ভক্তি হয় না। যদি কেউ শান্তি পান সেটা অন্য কথা’ (কিরীটী সেনগুপ্ত, ভনিতা, আয় না, পৃঃ২২)।
এ গ্রন্থের নান্দীমুখ লিখেছেন ডঃ উত্তম কুমার দত্ত। মুক্ত গদ্যঃ মুক্ত আত্মার স্নানঘরশীর্ষক ভূমিকায় তিনি ছুঁয়ে গিয়েছেন Creative Non-Fictional Streaming এর ইতিহাস। শংসাপত্র সুলভ উদ্দীপনায় ঘোষণা করেছেন, ‘... এবং যা চেয়েছিলাম, এ লেখায় তার চাইতে প্রাপ্তি ঘটল অনেক বেশি। কখনো লেখকের আত্মবিক্ষনের প্রতি কুর্নিশ জানিয়ে বলেছেন, ‘আত্মাও বিম্বিত হয় অলৌকিক মায়া-দর্পণে। আবার কখনো তিনি আত্মার মুখোমুখি। স্বোপার্জিত দর্শনের মণিময় আলোয় তিনি দেখেন নিজের পাপ, পতন, অবক্ষয়, নিহত অতীত, অস্থির বর্তমান আর সংশয়-ক্লিষ্ট ভবিষ্যৎ। নদীর গতিপথেও বাঁক থাকে। সরলরৈখিক গতিপথ অনেক সময় একঘেয়ে লাগে। অত্যধিক আলংকারিক শব্দের দ্যোতনায় মাঝে মাঝে এই ভুমিকা বড্ড বেশি কানে লাগে। সন্দেহের উদ্রেক করে,- এ শুধু হাইপ নয় তো! তবে কিরীটী আবার আমায় ভুল প্রমান করেন। সত্যি বলছি, ডঃ দত্ত একবর্ণ বাড়িয়ে বলেননি।
ছটি অধ্যায়ে বিন্যস্ত এই বই-এর প্রধান ইউ এস পি কিরীটীর ঝরঝরে ভাষা আর নিখুঁত টাইমিং। উইট আর আইরনির সাথে মিলেমিশে যায় কাব্যিক উচ্চারণ। কবি কিরীটী লেখেন, ‘আমি দেখার ঝক্কি কত- আয়নায় চিড় তো চুরমার স্বপ্ন। পরমুহূর্তেই লেখক কিরীটী ফোঁড়ন কাটেন, ‘পড়েছেন? কী বুঝলেন? মাথার উপর দিয়ে গেল, না? কবিতাটা লেখার পর আমিও যে নিশ্চিন্তে আছি সেটা বলব না’ (কিরীটী সেনগুপ্ত, সিঁড়ি, আয় না, পৃঃ ৩৬)।আবার গন্ধ গোকুল’-এর থিসিসআমাদের গায়ের গন্ধগুলোকে চিনিয়ে দেয়। পাঠক পকেটে হাত ঢোকায়। লেখক মিনতি করেন, ‘প্লিজ নাকে রুমাল দেবেন না, আমার কথাটা শুনে নিন আগে। কবি বলেন, ‘চুপি চুপি বলছে চরিত্রের কথা/ চরিত্রে রং আর গন্ধের নাম/ গোলাপ...। মাঝে মাঝে কান্নার গন্ধ ভেসে আসে একেকটা থিসিস থেকে, ভেসে আসে ভাতের গন্ধ। কারা যেনচার্চ ক্রিসমাসেভাত রাঁধছে। এই গন্ধ গুলো খুব স্পষ্ট নয়, তবে দেখবেন পড়তে পড়তে ঠিক অনুভব করবেন।অনবরত উইট-এর ঝনঝনানি পরিস্থিতি ঠিক সামলে দেয়।
শেষ অধ্যায় সমিদ্ধ। এটা কি ঘুমোতে যাবার আগে নিজের সাথে আলাপচারিতা, আমাদের আত্মকথন? মাঝে মাঝে ভ্রম জাগে, সবটা সত্যকথন নয় তো। পরক্ষনেই টের পাই, এটা একটা সামান্য বই মাত্র। লু স্যুন তো সেই কবেই বলেছিলেন, ‘একটা কবিতা কামানের সামনে চুপ করে যায়
এটা কোন আত্মজীবনী নয়। তাহলে আখ্যান?একটা জাতির ইতিহাস? শব্দমালা-নির্ভর ব্যাঙ্গচিত্র? হয়তো এই লেখাগুলোর সাথে তুলনা চলে মিশ্র মাধ্যমের ইলাস্ট্রেশন শিল্পের। কিছু স্কেচের এলোমেলো বিন্যাস আছে, তবে পূর্ণাঙ্গ অবয়ব তৈরি হয়না। লেখক সুনিপুণভাবে সে পথ এড়িয়ে গেছেন। বরং এলোমেলো ছেঁড়া ঘটনার কোলাজ নির্মাণের একটা চেষ্টা আছে।
এত ব্যাঙ্গ থাকা সত্বেও একটা সমর্পণের ইঙ্গিত পাওয়া যায় এখানে। চিরন্তন আধ্যাত্মিকতাকে নস্যাৎ করার কোন প্রচেষ্টা নেই, বরং নির্লিপ্ত ভাবে জীবনের প্রতি শ্রদ্ধাবনত হবার সূক্ষ্ম রূপরেখা আছে এখানে।গঙ্গা ধুয়েছি তোর পায়ে/ ভরপুর শেষ স্নান/ প্রথম প্রনাম মাটি গায়ে...(কিরীটী সেনগুপ্ত, স্নানের শেষে, আয় না, পৃঃ ৬৩)।
উপদেশ দেবার ইচ্ছে সম্বরণ করা হয়েছে অত্যন্ত সতর্কভাবে। আসলে জীবন মহানদীর বিভিন্ন ঘাট থেকে ঘট ভরে কাকস্নান সেরেছেন লেখক। দীর্ঘদিন স্নানহীন জীবনযাপনে অভ্যস্ত সমাজটাকে একটু কাকস্নান করানোর প্রয়াসকে নন্দিত না করে পরছি না। আর নিন্দা? ... একবার পড়েই দেখুন না!
পুনশ্চঃ সিপিয়া টিউনের সাথে ক্রস প্রসেসের মিশেলে এই বইয়ের প্রচ্ছদ নির্মিত হয়েছে। ভিড়ের পোস্টারাইজ ইমেজ মিশে গিয়েছে একটি মানচিত্রের সাথে। প্রচ্ছদ জুড়ে লালচে হলুদ কিছু ইনভারটেড কমা উজ্জ্বল ভাবে প্রতীয়মান হয়।আত্মবীক্ষণের প্রতীক?
প্রচ্ছদ শিল্পীঃ সেঁজুতি দাশগুপ্ত।
আয় না
কিরীটি সেনগুপ্ত
প্রকাশকঃ ধানসিঁড়ি, কলকাতা- ৭০০০৩৬
দামঃ ৭০ টাকা
ISBN: 978-81-926422-0-8

No comments:

Post a Comment