Content

Monday, July 20, 2015

কবিতাঃ ১৫ই আগস্ট



১৫ই আগস্ট


আমি কারো হাতে রাইফেল তুলে দিইনি
মণিপুর, মনোরমা অথবা চানু
আমি কারো বুকে এঁকে দিইনি ৩৭৭
আমি ভারভারা রাওকে কবি বলিনি
এরা এসব কেউ নয়
কয়েকটা গুজরাট, জঙ্গলমহল অথবা এফ ডি আই
তবু ছুঁয়ে যাই প্রচ্ছন্ন নির্ভার ভোর অথবা মধ্যরাতের স্বাধীনতা

জাহেরথান অথবা সারহুলি মন্দির



জাহেরথান অথবা সারহুলি মন্দির
 

স্মরণাতীত কাল থেকেই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা অজস্র আদিম জনজাতি প্রকৃতি আর প্রাকৃতিক সম্পদের রক্ষক হিসেবে কাজ করে চলেছে। চিরায়ত পূজাপার্বণ, আরাধনা তাদের সংস্কৃতির সাথে প্রকৃতির যোগাযোগ সুদৃঢ় করেছে। মানুষ তার বেঁচে থাকার প্রাথমিক শর্ত পূরণের জন্য বারবার হাত পেতেছে প্রকৃতির কাছে। প্রকৃতির সাথে সামাজিক সংযোগ ক্রমে অর্থনৈতিক লেনদেনের ব্যাল্যান্সশিট হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিল্পায়ন আর তার স্বাভাবিক ফলশ্রুতি হিসেবে ক্রমে ধ্বংস হয়েছে অরণ্যানী। এসব কথা অনেকেরই জানা। তবে যে কথা অনেকেই জানিনা, তা হ’ল – এখনও আদিম জনজাতির মানুষেরা তাঁদের সনাতন সংস্কৃতি রক্ষার ছুতোয় বাঁচিয়ে রেখেছে আমদের বনভূমি।
 
একদশকের কিছু আগে ভারত সরকার “The Biological Diversity Act 2002”-এর মাধ্যমে বনভূমি এবং বনজ সম্পদ রক্ষার যে দায়িত্ব নিয়েছেন, তার ঢের আগে থেকেই সংরক্ষিত বনভুমির ধারণা আদিবাসী সমাজে প্রচলিত। এর সবথেকে ভাল উদাহরণ হ’ল- বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা আদিবাসীদের অজস্র পবিত্র আরাধনাস্থল (sacred groves)।
সাঁওতাল সমাজে তাঁদের পবিত্র আরাধনাস্থল ‘জাহের থান’ নামে পরিচিত। সাধারণত বনের মাঝে বা গ্রামের সীমানায় থাকে এই ‘জাহেরথান’। এখানে অন্তত ৩০-৩৫টি শাল গাছ (Shoria robusta) থাকা আবশ্যক। একই সারিতে থাকা তিনটি শাল গাছের তলায় একটি করে পাথর পোঁতা থাকে। এরা তাঁদের মহান বোঙ্গা বা ঈশ্বরের প্রতীক। প্রথম পাথরটি মহান ‘জাহের’-এর উদ্দেশ্যে পোঁতা থাকে। অন্য দুটি পাথর যথাক্রমে- মারাং বুরু তুর্ক এবং মুরুকুকে প্রতিভাত করে। এদের কাছেই আসন গাছের তলায় পরগনা বোঙ্গা অধিষ্ঠান করেন। এছাড়াও মহুয়া (Madhuca indica) গাছের তলায় থাকেন গসাইন (এই পবিত্র স্থানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী)। 

 
লোকাচার অনুযায়ী ‘জাহের’ এই পবিত্রস্থানে আরাধনার অধিকার দিয়েছেন কাদেম নায়েক (পুরোহিত)কে। এর সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে অজস্র অলৌকিক গল্প আর কিংবদন্তী। ফলত এখানে কেউ গাছ কাঁটা’র কথা ভাবতেই পারেনা। এভাবেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সাঁওতালরা বাঁচিয়ে রেখেছেন তাঁদের পবিত্র বনভূমি।
‘Joint forest management Act’ বা অন্যান্য বনসংরক্ষণ কর্মসূচীর যথাযথ রুপায়ন ‘Community Based Approach’ ছাড়া অসম্ভব। কেননা, বনকে এঁদের থেকে কেউ বেশী চেনে না, জানে না। যে শ্রদ্ধায় এঁরা বনভূমিকে আগলে রেখেছেন, তা বহিরাগত বনকর্মীদের পক্ষে অসম্ভব।

সাথের ছবি প্রসঙ্গেঃ কর্মসূত্রে ঝাড়খণ্ড, পুরুলিয়া, সাঁওতাল পরগণা, মেদিনীপুরে বেশকিছু ‘জাহেরথান’ চোখে পড়েছে। অনুমতি নিয়ে ভেতরে যাওয়ার সৌভাগ্যও হয়েছে। সাথের ছবিটি ঝাড়খণ্ডের সালদোহা গ্রামে তোলা হয়েছে। একটু ভাল করে দেখলে বুঝতে পারবেন, এখানে একটা বিশেষ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। ‘শৌচ করা বারণ’।
আসলে ‘ইকো-ট্যুরিসম’-এর নামে শহুরে মানুষের জলসাক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল কাছেই। এটা তারই ফলাফল। যাইহোক, গ্রামের মানুষের বিরোধিতায় জলসা বন্ধ হয়েছে!

Sunday, July 19, 2015

RIP (Research in Progress)

RIP (Research in Progress)
বিধিসম্মত সতর্কীকরণ- এটা আমার আত্মকথন নয়। আমার জীবন ঠিক এর উল্টো। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন হতভাগ্য, নিপীড়িত, শোষিত গবেষকের আখ্যান। এরা সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে ধূমকেতু। তবে আমাশায় ভুগছেন আজকাল। কে জানে কখন তারা খসে ? ধূমকেতু বলে কথা! ও হ্যাঁ সব চরিত্র ও ঘটনা কাল্পনিক। যদি বাস্তবের সাথে কেউ কোন মিল খুঁজে পেয়ে থাকেন, তবে তাকে কাকতালীয় বলে ধরে নেবেন।

সকাল থেকে হরিপদ ক্যালানে আতা’র মত মুখ করে বসে আছে। অথচ দিব্যি হাসিখুশি মানুষ হরিপদপরিচিত মহলে মজার মানুষ হিসেবে ভাল নাম আছে। একটু- আধটু জাদু-টোনা জানে কিনা! তবে এটা তার নেশা। পেশা হ’ল গবেষণা করা। শুনলেই কেমন ভারি ভারি ঠেকে। মানুষটা তবে বেজায় পলকা। কসকো’র মত। ঠিক যেন পালকের স্পর্শ। হরিপদ অবিশ্যি একটা জিনিস বিশ্বাস করে, ‘পি এইচ ডি  করে কেউ আইনস্টাইন হয়না’। এহেন হরিপদ আজ বেজায় খচে গিয়েছে।
খচেন দা সকাল সকাল আনন্দবাজারটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘দ্যাখ কী লিখেছে! চমকে যাবি এক্কেবারে’। সত্যিই তো! ইউনেস্কো জানিয়েছে ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতে প্রতি ঘরে একটা করে পি এইচ ডি  স্কলার থাকবে। হরিপদ গুগুল করে একটা হিসেব কষে ফেলল। ‘ঢপ’! নিজের মনেই বিড়বিড় করল। তবে আনন্দবাজার বলে কথা! এরা পরিবর্তন আনতে পারে, আবার পরিবর্তনের পর কাঠি  হাতে কঠিন সংগ্রামে লিপ্ত হয়। আর সমস্যাটা হচ্ছে ভাল জিনিস যত কম হয় তত মঙ্গল। রবি ঠাকুর কবেই এসব বলেছেন। আসলে প্রতি ঘরে একটা করে পি এইচ ডি ‘র গপ্পটা সত্যি হলে গবেষণা জিনিসটা আর যুতসই থাকবেনা। স্নবিং এফেক্টটাই চলে যাবে।  সব দেখেশুনে হরিপদ খিঁচরে উঠেছে।
আজকাল ঠিকঠাক ঘুম হয়না। গবেষকদের জীবনে এই ফেজটা না এলে গবেষণাই মাটি। তবে হরিপদ’র সমস্যাটা এক্কেবারে ভিন্ন ধরণের। ঘুম একটু গভীর হলেই একটা স্বপ্ন দেখে সে। রাত জেগে গবেষণাপত্র লিখতে লিখতে টোকো ঢেঁকুর ওঠে। চারদিকে চুনোপড়া ঢেঁকুরের গন্ধ ক্রমশ ভারী হয়ে আসে। কেমন একটা নেশার মত লাগে। যেন অম্বল হয়েছে। তখনই দিস্তা দিস্তা লেখাগুলো একটা মলিন গামছার ত্যানা’র মত হয়ে যায়। অদ্ভুত ভাবে চেয়ে থাকে তার দিকে।  আর কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলে একটা শয়তানের জন্ম হয়। শয়তানটা ‘কন্ট্রোল এ’ প্রেস করে সব ডকুমেন্ট সিলেক্ট করে নেয়, তারপর শিফট ডিলিট। সব শেষ। হরিপদ চিৎকার করে ওঠে। কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বেরোয় না। অদ্ভুত পরিস্থিতি! এরপর খোনা গলায়  শয়তানটা বলে ওঠে, ‘কিস্যু হয়নি। রিভিউয়ারের কাছে পাঠালে আবার রিসার্চ রিপিট করতে বলবে’। স্বপ্নের মধ্যেই হরিপদ নিজের রিসার্চ সুপারভাইজারকে খুঁজতে যায়। কেবিনে বসে তিনি আখাম্বার মত ঘুমুচ্ছেন।হরিপদ করুণ ভাবে ডাকে, ‘স্যার’। কুতকুতে চোখ বন্ধ করেই তিনি বলেন, ‘উফ! কী জ্বালা। একটু বিশ্রাম নিতে দেবে না এরা। যা পারো করগে!  স্বাবলম্বী হও এবার’।
এরপর স্বপ্ন ভেঙে যায়!

কবিতা- আমার শিল্প অথবা তমসার ছবি



আমার শিল্প অথবা তমসার ছবি
যখন আমার শিল্প অথবা তমসার ছবি
আঁকা হয়েছিল তখনও রাত।
যখন চাঁদ তার রাগ নিয়ে
আর প্রেমিক যুগল বিছানায়
অজস্র বিষাদ জড়িয়ে শুয়েছিল,
আমি পেলব তুলি বুলিয়েছি ক্যানভাসে
উচ্চাশা অথবা দু’মুঠো ভাতের জন্য নয়
হাতির দাঁতের কাজ অথবা
আনন্দ ফেরি করার জন্যও নয়
বরং তাদের গোপনতম হৃদয়ের
সামান্য মজুরী হিশেবে আঁকা হয়েছিল।
সমুদ্রের সফেন লহরী’র মত পৃষ্ঠায়
মৃত্যুর অত্যুচ্চতায় মহৎ স্তোত্র-কবিতা,
তাজমহল অথবা বসন্তের কোকিলের জন্যও নয়
বরং দু’টি শালিখ অথবা প্রেমিকের জন্য, তাঁদের বাহু জুড়ে
জমে থাকা সুপ্রাচীন বিষাদের জন্য,
যারা প্রশংসা, মজুরী অথবা
আমার তুলির মনোযোগ- কোনটাই পায়নি।

(ইংরেজি ভাষার প্রখ্যাত কবি Dylan Thomas-এর কয়েকটি কবিতা পড়েছিলাম বেশ কিছুকাল আগে। সোনালী স্মৃতিরা রয়ে গিয়েছে, ইচ্ছেমত কাটছাঁট করে নিয়েছি। একেই কী বলে অনুসরণ/অনুকরণ, অনুবাদ? সাথের ছবিটা এঁকেছিলাম কয়েকদিন আগে। কবিতা’র সাথে সে ভাবে যাচ্ছে না, তাও দিয়ে দিলাম। ‘উত্তরাধুনিক’ বলে একটা কনসেপ্ট আছে না? ধরে নিন এটাও সেই পর্যায়ের একটা কিছু!!!) ।

দুর্বাসা



দুর্বাসা

অনন্ত ঘৃণার সাগর থেকে অজস্র নুড়ি কুড়িয়েছিস শুধু।

অভিসম্পাতের অমানিশা তোর মুখে, রিক্ততার বিষণ্ণতা সারা শরীরে, অজস্র কুটিল হাসি আর
নিজের হাতের কমণ্ডলুতে ভরে রেখেছিস হিংসার বীজ। তবু ক্লান্তিহীন নিন্দার বর্ণমালা, চাপা রাগ
যত অজস্র চোরকাঁটার মত বিঁধেছে।বিশ্রী কুষ্ঠ অথবা মৃত ধান-ভ্রূণের সত্যতা স্বীকারে অপরাগ
অনন্ত ঘৃণার সাগর থেকে অজস্র নুড়ি কুড়িয়েছিস শুধু।

প্রতিটি গাছে মর্মর ধ্বনির আকুতি, দুর্বলতা নয়, ভদ্রতার শেষ প্রাগৈতিহাসিক স্তোত্র অথবা স্তবগান যার
শেষ সম্বল, তার অভিসম্পাতজাত অমানিশার ভয় নেই। লাল ফলের সাজানো বাগানে শুয়ে রতি-রূপ
আর শব্দ সঙ্গীতের মাঝে আঁশটে গন্ধ ঘিরে জমে ওঠে শাম্ব হবার উপাদান। শকুন্তলা নয়, কুরূপ
আত্মমৈথুনের হতাশায় সাত্ত্বিক ল্যাঙটের ফাঁসে জমে তমসা শুধু।

অনন্ত ঘৃণার সাগর থেকে অজস্র নুড়ি কুড়িয়েছিস শুধু।

অণুগল্প - মুরগাতল পাহাড়ের মেঘ

অণুগল্প
  মুরগাতল পাহাড়ের মেঘ
রাঁচি’র আকাশে গুমোট মেঘ দানা বেঁধেছে। ধূপের ধোঁয়ার মত মেঘ জড়ো হচ্ছে মুরগাতল পাহাড়ের মাথায়। আমি জানলা থেকে স্পষ্ট দেখতে পাই। মেঘের ভাজে ভাজে ঘোলাটে ঘূর্ণির মত আলো উঁকি দিচ্ছে। আমি জানি এ মেঘে বৃষ্টি হয়না। একটা গল্প মনে পড়ে যাচ্ছে। অবিকল এই মেঘলা দিনের গল্প।
সেবার চাষের মাসে বৃষ্টি হয়নি। সহদেব বেদিয়া মহুয়াটুংরিতে থাকে।দুই একর জমি, তার মধ্যে এক একর টাঁড়।টাঁড়ে চাষবাস হয়না। দোনে যেটুকু জমি আছে, তাতে একবার ধান হয়। কিছু জমিতে মাড়ুয়া আর ঘরের আশেপাশের জমিতে, জংলায় লতানে পাতা- সবজি চাষ হয়। দোনে মাঝে মাঝে বিলাতি টম্যাটো লাগায়। টম্যাটো পোড়া দিয়ে ভাত আর হাড়িয়া- এই ছিল সহদেবের জীবন। ও হ্যাঁ একটা বুড্ঢি মা আছে।
যেবারের কথা বলছিলাম, সেবার বৃষ্টি হয়নি।হাড়িয়া খাবার পয়সা নেই।পেশা ছুটলেও নেশা ছোটে না। সহদেব অন্যদিনের মতই ধারে মাল খেতে গিয়েছিল। সেখানেই কাজের সন্ধান দিল রাবু। রাবু নিজেও একই কাজ করে।
পরদিন সূর্য ওঠার আগেই সহদেব আর রাবু ট্রেকারে উঠে পড়ল। প্রথমবার খাঁচায় এলে মুরাগারা যেভাবে ভাবলেশহীন মুখে চেয়ে থাকে, সেভাবে সহদেবও রাবু’র দিকে চেয়েছিল। আশেপাশের গ্রাম থেকে লোকজন ভিড় করেছে। গাড়ি থামল মোরাবাদি ময়দানের কাছে। হুড়মুড় করে ভিড়টা নেমে গেল রাস্তায়। কাজের আশায় সকলে দাঁড়িয়ে আছে। সারি সারি কুসুম গাছের বাগান যেন। শহুরে বাবুরা এসে লেবার পছন্দ করে নিয়ে যাচ্ছে। সহদেবের ভাগ্যটাই খারাপ। বেলা ন’টা। এখনও সে বিক্রি হয়নি। শেষে দেড়শ টাকা রেটে নিজেকে বেঁচে দিল বাড়ি তৈরির ঠিকাদারের কাছে।
মুরগাতল পাহাড়ের তলায় নতুন ফ্ল্যাটবাড়ি তৈরি হচ্ছে। অনেক লেবার দরকার। সহদেব তার মা’কে নিয়ে এল। বুড়ীর এখনও তাকত আছে। বৃষ্টি আসার নাম নেই। এভাবে দিনকয়েক চলছিল। হটাৎ আকাশে মেঘ করল। সহদেব তখন বাঁশের মাচায় চেপে সিমেন্ট জোগানোর কাজ করছে। মেঘের দিকে চেয়ে কেমন আনন্দ হল। আবার মিলিয়ে যায় সবকিছু।এখন ঘরে ফেরা যাবে না। মাঠ ভিজে যাবে, আগাছারা বেড়ে উঠবে, তবু সহদেব যেতে পারবে না। কী হবে ধানের বীজ আর পবিত্র বীজতলার?
কিছুই হয়নি। রক্তারক্তি কান্ড। অন্যমনস্ক সহদেব উঁচু মাচা থেকে সোজা পাথরে পড়েছে। দেহটা তখনও ছটফট করছে। ভেসে যাওয়া লাল স্রোতে দু’ ফোঁটা জল। ডুকরে উঠল মা।আঁসু নয়, আকাশের জল পড়েছে সহদেবের রক্তের স্রোতে। আলুথালু চুলে বুড়ী অজস্র অভিসম্পাত বর্ষণ করতে শুরু করেছে। ততক্ষণে সারনা’র পবিত্র জঙ্গলে, শাল বনের ছায়ায় উচ্চারিত হচ্ছে আদিম ডাইন বিদ্যার সব অলৌকিক মন্ত্র। জেগে উঠলেন মারাং বুরু। বুড়ী অবিরাম বিড়বিড় করে চলেছে। অপলক দৃষ্টি মেঘের দিকে। বুড়ীর চোখে জমা হয়েছে দশ হাজার বছরের জিঘাংসার মেঘ। দশ হাজার বছর, আমাদের চাষের।
এরপর এতগুলো বছর পেরিয়েও বুড়ী ডান বেঁচে আছে মুরগাতল পাহাড়ে। ক্রমে সহদেবের রক্ত মিশেছে মাটির লালে।মুরগাতল পাহাড়ের পায়ের কাছে গড়ে উঠেছে রঙিন আবাসন। বেড়ে উঠছে রাঁচি। শহরের আকাশ কালো করে মেঘ জমে। সারা শহর ভেসে যায় বৃষ্টি ধারায়।কিন্তু মুরগাতল পাহাড় ভেজে না। মেঘের ছায়া পড়ে পাহাড়ে। তখনই মেঘের ভাজে ভাজে ঘোলাটে ঘূর্ণির মত আলো উঁকি দেয়। পাহাড় ভেজে না। এই উষরতায় কোন ঘাস-লতাও জন্মায় না। জন্মায় শুধু কংক্রিটের আগাছা।