Content

Wednesday, November 4, 2015

শুভ জন্মদিনঃ ঋত্বিক ঘটক



ঋত্বিক ঘটক

আমরা যারা উত্তরবঙ্গের বাঙালি , তাদের অধিকাংশই ওপার বাংলার। ছেলেবেলায় দাদু-দিদার বলা ভূত-রাক্ষসের গল্পের সাথে জড়িয়ে থাকত ওপার বাংলার গল্প।দোমড়ানো চামড়ার অজস্র বলিরেখায় শিশিরের মত জমে থাকত শত বিঘা জমি, পাথরের জামবাটি, শিলনোড়া, কাঁসার বাসন আর দুর্গাপূজার গল্প।অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে উত্তর-দক্ষিণে ছিটকে যাবার বৃত্তান্ত মাঝেমাঝেই চুপসে যেত বেলুনের মত।তবু ফিরে ফিরে আসত, আপনার সিনেমার মত। আমার বৃদ্ধা দিদা শেষ বয়সে ফিরতে চান দেশের বাড়ি। শীতের নিভুনিভু আগুনের উত্তাপে হাত সেঁকতে সেঁকতে দিদা বলতেন নতুন করে শুরু করার গল্প। নিজের ভাই থেকে গেলেন দক্ষিণবঙ্গে। সেই এক গল্প। চাকরি খোঁজার লড়াই। অবিকল আপনার সিনেমার মত।
বাবার বংশেও একই গল্প। একদল থেকে গেল দক্ষিণবঙ্গে। আরেক দল উত্তরে। দুই প্রজন্মের অনেক তফাৎ বেড়ে ওঠায়, ভাষায়।এ অঞ্চলের মানুষ কলকাতায় এলে মুখ খুলতে ভয় পায়, কেননা তাঁদের ভাষা শুনলে লোকে হাসে। এভাবেই ক্ষমতাবানদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বার বার আঘাত হানে সমস্ত আঞ্চলিক কৃষ্টির উপর।একারণেই ব্রাত্য থেকে যান অমিয়ভূষণ মজুমদার, জগন্নাথ বিশ্বাস, বেণু দত্ত রায় আরও অনেকে... । এভাবেই আপনাকে চিনতে থাকি। নিজের মত করে। আমাদের এখানে মাতৃভাষা দিবসের কবিতা লেখা হয় এভাবে- -এবার বলি তোমার ভাই/ ভাষাটা খুব যাচ্ছেতাই/ পাল্টে ফেল তাড়াতাড়ি/ নইলে খাবে টিটকারি।/... তুই তো ব্যাটা কইলি বেশ/ ভাষা ছাড়ুম, ছাইড়া দেশ!/এখন ভুলুম নিজের নাম/ নাই এদেশে ভাষার দাম!!!’ (একুশে ফেব্রুয়ারী, গৌতমেন্দু রায়)।এই বেদনা আপনি ছুঁয়েছিলেন। এই বেদনায় আপনি বেঁচেছিলেন।
আপনি ভেরিয়ার এলুইনকে চিনতেন? আপনারা হয়ত একই মানুষ ছিলেন। ছোটনাগপুরের যে জঙ্গলে আপনি গিয়েছিলেন, সেখান থেকে অজস্র মানুষ আমাদের এখানে চা বাগানের শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে এসেছিল। সেদিনও তারা ছিল সস্তার শ্রমবাহিনী, আজও তাই। এখনো আমার বাড়ির কাছে কোন বন্ধ চা বাগানে, পাহাড়ে অরন্যে জেগে ওঠে সভ্যতার আদিম সন্তানরা। অন্ন বস্ত্রের শোক ভুলে... উৎসবের মাদকতায়। সমস্ত দিন বন্ধ চা বাগানের সামনে আন্দোলনে পোজ দিয়ে ... বিষাক্ত কচু খুঁজে ঘরে ফেরে সাইলও, রাবু, কৃষ্ণ।পাহাড়ের ছায়া পড়ে তখন গ্রামের উঠোনে। তারপর ভাঙা ঘরের ফুটিফাটা চাল চুইয়ে চাঁদের আলোর ধারা নেমে আসে সারা গ্রামে। জার-ইউ-হাঁড়িয়ায় মদ্যপ অসভ্যরা মেতে ওঠে আদিমপ্রমিস্কিউতিতে। জেগে ওঠেন দাই চিকো শিরি। সাবট্রপিকাল চিরহরিৎ অরণ্যে শোনা যায় ধামসার নিনাদ। চাঁদের দিকে তাকিয়ে তখন কোন কোন আ্যবওরিজিনালপ্রশ্ন করে ... বহু পুরনো প্রশ্ন। ধামসা-মাদলের আদিম আবহে খোলা আকাশের নীচে দাঁড়ানো সেই আদিবাসী কণ্ঠে জেগে ওঠে আপনার সিনেমার সুর।সে সুরে কোন জিঘাংসা নেই, কোন শ্লেষ নেই। বরং উৎসবের তালে তালে মূর্ত হয় একটি সরল অথচ আদিম প্রশ্ন। সব থেকে আদিম প্রশ্ন। আফ্রিকার থেকেও, মানুষের থেকেও, সভ্যতার থেকেও আদিম প্রশ্ন।

হে হে...হেই হে... এ...এ...এ...এ...
ছোকরা চাঁদ, জোয়ান চাঁদ/ ছোকরা চাঁদ, জোয়ান চাঁদ/ ছোকরা চাঁদ, জোয়ান চাঁদ
হে হে...হেই হে... এ...এ...এ...এ...
খবর শোনাও, একটা ছোট্ট খবর তো শোনাও ভাই... শোনাও ভাই...শোনাও ভাই
হে হে...হেই হে... এ...এ...এ...এ...
ছোকরা চাঁদ, জোয়ান চাঁদ/ ছোকরা চাঁদ, জোয়ান চাঁদ/ ছোকরা চাঁদ, জোয়ান চাঁদ
হে হে...হেই হে... এ...এ...এ...এ...
যখন সূর্য উঠবে, ভোরের আলো ফুটবে/ তোমায় সেই খবরটা বলতে হবে-
হে হে...হেই হে... এ...এ...এ...এ...
কি জানতে চাই, আহা! ব্যস্ত কেন- এখনই তা বলছি শোন
সূর্য উঠবে যবে/ কানে কানে বলে যাবে---
কেমন করে কিছু খেতে পাই, কিছু খেতে পাই’’? (প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গানের অংশ)


No comments:

Post a Comment