Content

Sunday, December 21, 2014

টুকরো ভ্রমণ- ফিডার ক্যানেলের ধারে



একটা কাকতাড়ুয়া দিব্যি মিটিমিটি হাসছে

ফিডার ক্যানেলের ধারে
২০/১২/২০১৪, আলমপুর, মুর্শিদাবাদঃ
প্রীতম-নবীনদের বাড়িতে রাতটা বেজায় ভালো কাটল। হরেক খাবার, দুরন্ত আতিথেয়তা, তাসের আড্ডা, বাংলাদেশের ‘বই’ – এসব পেরিয়ে যখন ঘুমোতে গেলাম, তখন রাত আড়াইটা বাজে। চোখ মুদে আসার আগেই একটা জন্তুর ডাকে নড়েচড়ে বসলাম। দোতলার ছাদে তখন হিম ঝরা শীত। তবুও উঁকি ঝুঁকি মারলাম। পরদিন সকালে শুনেছিলাম, ‘ও কিছু না, শেয়ালের ডাক!’
সকাল সকাল (পরিচিতরা জানেন, আমার সকাল কখন হয়) এক পেট খেয়ে তবে বেরুনো গেল। শীতের সকাল জুড়ে কুয়াশার একটা গন্ধ লেগে থাকে। সে গন্ধ নাকে মুখে জড়িয়ে আমরা চললাম ফিডার ক্যানেল দেখতে।
‘ফিডার ক্যানেল’কে স্থানীয় লোকেরা বলে কাটা গঙ্গা। ২২৪৫ মিটার লম্বা রেল-বাস সেতু সমন্বিত ফারাক্কা ব্যারেজের কথা সকলের জানা। ছেলেবেলায় ফি বছর কলকাতায় আসতাম। সে সময় ট্রেনের দুলুনি উপেক্ষা করে জেগে থাকতাম শুধু ‘ফারাক্কা ব্রিজ’ দেখার আশায়। যাইহোক, ৩৮.৩৮ কিলোমিটার লম্বা ফিডার ক্যানেল শেষ হয়েছে এখানে। এই ক্যানেল ৪০,০০০ কিউসেক জল ধরে রাখে। চাঁদপুরের কাছে ফিডার ক্যানেল দেখে মনে হয়েছিল, কেউ যেন সুনিপুণভাবে গঙ্গা থেকে একটা সরলরেখা টেনে দিয়েছে।
গঙ্গা থেকে একটা সরলরেখা

চারদিকে কোন ব্যস্ততা নেই। মরা ভাগীরথীর তীরে বটের ছায়ায় ঢেকে আছে শ্মশানঘাট। নবীনের বাইক চলেছে ধুলো উড়িয়ে।
ক্যানেলের কাছে আসতেই দেখতে পেলাম পিলপিল করে লোক এসে ভিড় করছে নৌকোর কাছে। ছাগল, মানুষ, বাইক - সকলে একসাথে সাওয়ার হয়েছে। এর মধ্যে এক বৃদ্ধ মাঝি নোঙর খুলতে এসেছে। তাকে দেখেই নেড়ি কুকুরের দল হাভাতেপনা শুরু করে দিল। লোকটা ঝোলা থেকে পাউরুটি বের করে খেতে দিচ্ছে। এসব রোজকার গল্প।
ক্রমে বেলা বাড়ে। মেঘের কলেবর সরে গিয়ে পাকুড় গাছের ফাঁকে ফাঁকে এখন কয়েক ফালি রোদের ঝিলমিল। চারদিক কেমন পিকাসোর আঁকা ‘ন্যুড, লিভস অ্যান্ড বাস্ট’- এর মতো সরসরে রঙে ভরে যাচ্ছে। রঙচটা স্কুল বাড়ি, বাঁশ বনের ছায়া মাড়িয়ে আমরা হেঁটে চলেছি। স্যাঁতস্যাঁতে মাটির সোঁদা গন্ধ আর শ্যাওলা ঢাকা পুকুরের পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা শতাব্দীপ্রাচীন বটবৃক্ষের ছায়া- এসব অনুভূতিরা একসাথে মিলেমিশে একটা অসাড় মদকতা তৈরি করে। সব পেরিয়ে দিগন্ত বিস্তৃত উজ্জ্বল হলুদ সরষে ক্ষেতের মাঝে মাঝে কয়েকটা সবুজ আমগাছ। খানিকটা পপুলার এগ্রো-ফরেস্ট্রি মডেলের মতো। আরও এগিয়ে গেলে দিগন্তরেখার কাছে একটা সদা ফিতে চোখে পড়ে। ওটা আসলে ভাগীরথী।
ক্ষেতের আল ধরে আমরা এগিয়ে চলেছি। হটাৎ মনে হ’ল, কে যেন আমাদের দেখছে। পেছন ফিরে দেখি- একটা কাকতাড়ুয়া দিব্যি মিটিমিটি হাসছে। ওর পায়ের তলায় মখমলের মতো সবুজ ধানক্ষেত।
পাউরুটি বের করে খেতে দিচ্ছে
দিগন্ত বিস্তৃত উজ্জ্বল হলুদ সরষে ক্ষেতে

 
ছাগল, মানুষ, বাইক - সকলে একসাথে সাওয়ার

No comments:

Post a Comment