কামতাপুরের ধরলা নদী আর ছেলেবেলার মেঘ
( ‘লেখালেখি’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘কামতাপুরের রাজপাটঃ একটি বিস্মৃত রাজধানী’র
প্রত্নখনন’ শীর্ষক প্রবন্ধের অংশবিশেষ)
বর্ষার সময় আমাদের উত্তরবঙ্গের
গ্রামগুলো গাঢ় সবুজ হয়ে যায়। কালচে মেঘের ছায়া পড়ে পুকুরের জলে। মাঝে মাঝে আকাশের
গোঙরানি আর চপচপে হিউমাস কাদায় চপর চপর শব্দ আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। এরপর অবিরাম
ধারাপাত। মানকচু’র ছাতা মাথায় আড়ষ্ট
পায়ে ছুটে চলে মাঠ ফেরত কিশোরী...। ক্রমশ বৃষ্টি ধারায় ঢেকে যায় সবকিছু। খড়ের
ছাউনি চুইয়ে বৃষ্টি ঝরে ঝরে পড়ে। ভেসে আসে গরুর ডাক। তোর্সা পারের বিস্তীর্ণ
সমভূমিতে এসময় ধানের বীজ ফুঁড়ে সবুজ প্যাস্টেল ঘষা নির্মলতা।তবুও এই রঙ আর
নির্মলতায় একটা বেদনার সুর ভেসে আসে। শট ট্রানসাকশন
হয়। মেঘের ফাঁকে ফাঁকে অপার্থিব আলো।তবুও মায়ের কান্নার মত অজস্র বারিপতন...।
বন্যার আশংকা আর স্যাঁতস্যাঁতে অ্যাজোলা মাড়িয়ে ধান ক্ষেতে কাজ করে হারান মিঞা আর
রুনু বর্মণ। ফোলা চোখে চেয়ে থাকে চাষির পো।তার ফোলা চোখ, চ্যাপ্টা ঠোঁটে লেগে থাকে
বৃষ্টিবিন্দু।চারদিক কেমন ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে ওঠে।বৃষ্টি সিক্ত অজস্র এলোমেলো বাতাস
এই দিগন্ত বিস্তৃত ক্যানভাসের হলদেটে সান্দ্র রঙ শুষে নিতে পারেনা। তার ফোলা চোখের
অবাক দৃষ্টি আর মেঘ ভাঙা আলোয় ধানক্ষেতের মান্তাজে ধরা দেয় সত্যজিতের নিশ্চিন্দিপুর।
কেন, কীভাবে – জানিনা।
রবিশঙ্করের সুরে বাজতে থাকা বাঁশীর মত বুক দোমড়ানো সুরে রিক্সাওয়ালা গেয়ে ওঠে
কামতাপুরের আদি সঙ্গীত-
‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দেরে
উড়িয়া যায়রে চকোয়ারে পংখী
বগীক বলে ঠারে
ওরে তোমার বগা বন্দী হইছে ধল্লা নদীর পারে রে’।
‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দেরে
উড়িয়া যায়রে চকোয়ারে পংখী
বগীক বলে ঠারে
ওরে তোমার বগা বন্দী হইছে ধল্লা নদীর পারে রে’।
ভাওইয়া গানে
এভাবেই ফিরে ফিরে আসে জল-জমি-জঙ্গলের কথা। এ গানেও একটা নদীর নাম আছে- ‘ধল্লা’। এই
‘ধল্লা’ নদী বোধহয় ‘ধরলা’ নদী।‘ধরলা’ নদীর কথা পাওয়া যায় ডাঃ বুকানন হ্যামিলটন
সাহেবের কামতাপুর ভ্রমণের কাহিনীতে। সেটা ১৮০৯-১০ সাল।তথ্য বলছে, সে সময় কামতেশ্বর
রাজার রাজধানীর পূর্ব দিকে ছিল ‘ধরলা’ নদী।কামতাপুরের উত্তর-দক্ষিণ-পশ্চিম জুড়ে
বিদ্যমান ছিল বিশাল মাটির গড়। ধরলা নদী শত্রুপক্ষের আক্রমণ থেকে এই রাজপাট রক্ষা
করত। এ প্রসঙ্গেও উপযুক্ত তথ্যাদি রয়েছে। যাইহোক, সে আর এক ইতিহাস। তবে ‘ধরলা’
নদীর বর্ণনা করতে গিয়ে হ্যামিলটন সাহেব ‘বিশাল’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন ১*।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ‘ধরলা’ নামে যে নদীটি কামতাপুরের গড়ের কাছে প্রবাহমান-
তা একটি শীর্ণকায়া উপনদী।কোন পূর্ণিমার রাতে একে রূপোলী ফিতে বলে ভ্রম হয়। আগেই
বলা হয়েছে হ্যামিলটন সাহেবের বর্ণনা অনুযায়ী কামতেশ্বর রাজার রাজধানীর পূর্ব দিকে
ছিল ‘ধরলা’ নদী।আমরা যে ‘ধরলা’ নদীর রেফারেন্স এখানে টানছি, তা গড়ের উত্তর দিকে
প্রবাহমান। এক্ষেত্রে দুটো হাইপোথিসিস দাঁড় করানো যায়- ১)হ্যামিলটন
সাহেবের দেওয়া তথ্য ঠিক নয় অথবা ২) আমরা যে ‘ধরলা’ নদীকে কামতেশ্বর রাজার গড়ের
রক্ষী বলে ধরে নিচ্ছি, তা আসলে ইতিহাসে বর্ণিত ‘ধরলা’ নদী নয়। এক্ষেত্রে আরও একটা
প্রশ্নের উদ্রেক হয়ঃ তাহলে গোঁসানিমারির গড় কি কামতেশ্বর রাজার রাজধানী নয়?
বলাবাহুল্য, উত্তরবঙ্গে ‘ধরলা’ নামে একাধিক নদী আছে।জলপাইগুড়ি জেলার উপকণ্ঠে
অবস্থিত শহর ময়নাগুড়ি ১**। এই শহর গড়ে উঠেছে ‘জড়দা’ নদীর তীরে। এই নদীর
গতিপথ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর একটি উপনদী রয়েছে যার নাম ‘ধরলা’। প্রসঙ্গত
উল্লেখ্য, ময়নাগুড়ির খুব কাছেই জল্পেশ্বরের মন্দির। এই মন্দিরের নাম অনুসারে এই
জায়গাটির নাম হয়েছে ‘জল্পেশ’ ১***।‘জড়দা’ নদী এই জনপদের পাশ দিয়ে বয়ে
কোচবিহার জেলার চ্যাংড়াবান্ধার কাছে এসে ‘ধরলা’ নামে প্রবাহিত হয়েছে। এরপর এই নদী
বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মানসাইয়ের সাথে মিশেছে। এই মানসাই আসলে জলঢাকা।
এই নদীর সাথে ব্রহ্মপুত্র নদের একটা যোগ পাওয়া যায়। শোভেন সান্যাল তাঁর বিখ্যাত
গ্রন্থ ‘কোচবিহার কিছু কথা কিছু ইতিহাস’-এ এই ধাঁধার সমাধান করেছেন-
‘বর্তমানের ধরলা
এবং সিঙ্গিমারি নদীর সঙ্গে ডাঃহ্যামিলটনের বিবরণের যথেষ্ট তফাত থেকে যাচ্ছে। এই
তফাতের একটাই কারণ উত্তরবঙ্গের নদীগুলির ঘনঘন দিক পরিবর্তন।এখন নানারকম
সংরক্ষণমূলক বাঁধ প্রভৃতি দেওয়ার ফলে নদীগুলির মোটামুটি একটা স্থায়ী গতিপথ আছে।
কিন্তু কয়েকশো বছর আগে এসব কিছুই ছিল না।ফলে প্রতিটি বন্যাতেই নদীর গতিপথের
পরিবর্তন ঘটত। ধরলা নদীর গতিপথ নিয়ে আলোচনা করতে গেলেও সেই একই ইতিহাসের
পুনরাবৃত্তি দেখা যাবে’।
বৃষ্টি থেমে গেলে
একটা মনমরা রোদ চোখ ভিজিয়ে দেয়।ধরলা নদীর তীরে ভেজাভেজা বালির ওপর জমা হয় শেষ
বিকেলের আলো। শতশত বছর ধরে বর্ষাকালেই বদলেছে ধরলার গতিপথ। হয়তো কাকতালীয় হবে,
কিন্তু ধরলা আবিষ্কারের দু’শ বছর পর আমিও এখানে এসেছি এই বর্ষাকালেই। হু হু করে
বয়ে আসা বর্ষার বাতাসে দুলে দুলে ওঠে সুপুরি বনের সারি। তখনও দিনহাটা মফস্বলে
ঘিঞ্জি শহুরে আবাস তৈরি হয়নি। সমস্ত দিন মেঘ কালো ছায়া ঢেকে দিত গোঁসানিমারি গড়ের
বাঘ দুয়ার। মেঘের ফাটল চুইয়ে ঝরে পড়ত অপার্থিব আলোর রেণু। কোন মানুষের হেলদল নেই।
পুরনো বটের মত নির্লিপ্ত ভঙ্গীতে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকত মাটির গড়ের শেষ চিহ্ন। চোখ ফোলা
বুড়োরা তৈরি করত অজস্র কিংবদন্তী।
তথ্যসূত্র নির্দেশঃ
১) কোচবিহার কিছু কথা কিছু ইতিহাস- শোভেন সান্যাল। (১*, ১**,
১***)
২) বিষয়ঃ কোচবিহার- কোচবিহারের ইতিহাস – ডঃ নৃপেন্দ্রনাথ
পাল।

No comments:
Post a Comment