Content

Thursday, October 16, 2014

কয়েকটি জরুরী সংলাপ




অলংকরণ- শ্রী শাম্ব

নন্ত রোদের ছায়া পেরিয়েছি নিদারুণ ভালবাসায়
ইতি উতি ছড়িয়ে আছি আমি আর অপরাজিতা
নপুংসক যদি ছিঁড়ে খায় যোনি অথবা আমাদের অক্ষরমালা
ক্লীবতা জড়ো হয় - সরাদিনমান শুধু স্তাবকতা

জেনে গেছি আমরা রাষ্ট্রের জারজ সন্তান
ঘাসে ঘাসে সোহাগচুম্বন অথবা অজস্র করতালি
মেঘের পেটে মেঘ জমেছে, প্রসববেদনাহীন
সত্যকাম কিম্বা কামদুনি – অপরাজিতা অথবা চোরাবালি

এই এলোমেলো জীবন ১




সাতপুরা পাহাড়ের গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ানোটা আর কষ্টসাধ্য নয়। রাত ফুরোলেই জলগাঁও ফিরে আসার হাতছানি। এ গ্রামে ( মালদা) এটাই শেষ রাত। বিনোদ পাওয়ারা’র সাথে শুয়ে আছি সীমাহীন অন্ধকারের তলায়। পাহাড়ের কোলে মাড়ুয়ার খড় বিছিয়ে বিছানা তৈরি হয়েছে।
মহুয়া ফল শুকিয়ে রাখা হচ্ছে
তার উপরে পেতে দেওয়া হয়েছিল শতচ্ছিন্ন চাদর। আকাশে চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে। ঝিরিঝিরি জোছনা ঝরে পড়ছে অবিরাম। আমি চোখ খোলার চেষ্টা করি।বিন্দু বিন্দু জোছনার ধারা চোখের পাতায় ঝরে পড়ছে। আমার চোখ ভারী হয়েআসে।
মালদা থেকে ঘণ্টা চারেক পায়ে হাঁটলেই পাহাড়ের আরও উপরে একটা গ্রাম আছে, কেদলি। ওখানে ভিল উপজাতির লোকেরা থাকে। বলাবাহুল্য, দু’তিন দিন আগে ওখানেও ডেরা বেঁধেছিলাম। বাদনু ভিল আমাকে জোর করে মহুয়ার ফল হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল। আধাখ্যাচড়া হিন্দিতে যে কথাটা বলেছিল, তার মর্মার্থ- ‘এই পবিত্র ফল আমাদের কথা তোমায় ভুলতে দেবে না’।
এরপর আরও তিন বছর কেটে গেল। এসব স্মৃতিরা এখন গল্প ছাড়া কিছু নয়।
সেদিন নাগের আবদারে শুয়োরের মাংস খেতে সুরেশদের বাড়ি গিয়েছিলাম। বর্ষার বাতাসে তীব্র গন্ধ ভেসে এল। এ গন্ধ আমার বহুপরিচিত। রুদ্র কতগুলো ফল দেখিয়ে বলল, ‘চিনতে পারলে?’ আমি আমতা আমতা করছিলাম।
এরা সেই পবিত্র ফল, যারা অনেক দিনের পুরনো হলদেটে স্মৃতিদের উস্কে দেয়। বাদনু একথাই তো বলেছিল। শেষ বিকেলের ভেজা আলোয় এই তীব্র বনজ ঘ্রাণ মিশে চারপাশে একটা অপার্থিব মাদকতা তৈরি করেছে। অনেকটা সাতপুরা পাহাড়ের কেদলি গ্রামের মত।
অজস্র বিষণ্ণ মুখের ভিড়ে আমার সন্ধ্যা আরও বিষণ্ণ হয়ে ওঠে... সাতপুরা পাহাড়ের ঢালে অনেক গুলো বিষণ্ণ সন্ধ্যা আমি ফেলে এসেছি।
'খরা দাও ঈশ্বর'- মালদা গ্রামের খণ্ডচিত্র


হারাষ্ট্রের উপজাতি অধ্যুষিত জেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম নন্দুরবার। এই জেলার নানা প্রান্তে ক্ষেত্র সমীক্ষার কাজে ঘুরে বেড়িয়েছি এক মাস। ২০০২ সালে প্রকাশিত একটি সূত্র জানাচ্ছে এ অঞ্চলের ১৪৮টি পরিবারের ১৫৩ টি শিশু অপুষ্টিজনিত কারণে মারা গিয়েছে শেষ একবছরে। আমি যে সময়ের কথা বলছি সেটা ২০১১। পরিস্থিতি খুব একটা বদলায়নি। একেকটা গ্রামে প্রায় ১০০% মানুষের জমি মহাজনের কাছে বন্ধক। লুকিয়ে গ্রাম ছেড়ে পালাচ্ছে পুরুষরা। কাছেই গুজরাট।

সাতপুরা পাহাড়ের কোলে...

গ্রামের নারী-পুরুষ সেখানে দিন মজুরের কাজ নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। গ্রামে শুধু বৃদ্ধ আর শিশুরা রয়ে গিয়েছে। সরকারি কর্মকাণ্ড যেখানে স্তব্ধ, সেখানে নতুনভাবে সব শুরুর আহ্বান জানালেন নীলিমা মিশ্র। ইনি ২০১২ সালে রমণ ম্যাগসেসাই (এশিয়ার নোবেল) পান। পদ্মশ্রী পেলেন ২০১৩ তে। এঁর সাথে কাজ করার বিরল অভিজ্ঞতা হয়েছে এই সময়।


Nileema Mishra, Harish Hande win Magsaysay award 






এক মদ্যপের অসংলগ্ন আত্মকথন

মদ্যপ লোকটা
‘How agonized we are over how people die... how untroubled we are by how they live’ 
- P. Sainath 

সারাদিনের ক্লান্তি শেষে বুড়ো বট গাছের তলায় বসে আছি আমরা। সূর্যের নিদারুণ অভিঘাতকে উপেক্ষা করে ঠায় দাঁড়িয়ে বুড়ো বট গাছ। তার বিস্তৃত ডালপালা আর পাতার ছায়ায় বসে জিরিয়ে নিচ্ছিলাম আমরা। সামনেই বিরকার গ্রামের শীতলা মন্দির ।
পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলদা ব্লকের অন্তর্গত এই গ্রামে ‘লোধা’ উপজাতির বাস। ব্রিটিশ নৃতত্ত্ববীদরা এদের ‘Denotified Tribe’ (‘জন্মদাগী অপরাধ প্রবণ জাতি’)হিসেবে চিহ্নিতকরেছেন। এরা ‘প্রটো অস্ট্রালয়েড’ শ্রেণীর অন্তর্গত। স্বাধীনতা উত্তরকালে অধ্যাপক প্রবোধ কুমার ভৌমিক লোধাদের উপর গবেষণা শুরু করেন। ১৯৫৫ খ্রিস্টা
ব্দে অধ্যাপক ভৌমিক ‘বিদিশা’ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। মূলত লোধাদের পুনর্বাসন এবং সমাজের মূলস্রোতের সাথে একাত্মীকরণই ছিল এই আশ্রম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য।২০১১’র শেষ দিকে প্রথমবার ‘বিদিশা’য় গিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল ‘বিদিশা’কে ‘বেস ক্যাম্প’ হিসেবে ব্যবহার করে বিরকার গ্রামের ‘লোধা’দের আর্থ-সামাজিক জীবন যাপন অধ্যয়ন করা।
শীতলা পূজা কখনই লোধাদের ধর্ম বা সংস্কৃতির অঙ্গ নয়। তাহলে বিরকার গ্রামে শীতলা মন্দির কেন? এটা বোঝার জন্য কোন রকেট সায়েন্স জানার দরকার নেই। বলা বাহুল্য, উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের প্রভাবেই এহেন ‘অ্যাকালচারেশন’। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, শীতলা পুজাই এ গ্রামের একমাত্র বড় উৎসব।
বিদিশা আশ্রম
বট গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম, মন্দিরের কাছেই হাড়িয়া বিক্রি হচ্ছে। অনেকক্ষন ধরে এক মাতালকে লক্ষ্য করছিলাম। লোকটা উদ্ভ্রান্তের মত দৌড়চ্ছে আর চিৎকার করছে। কুচকুচে কালো শরীরে কাদা মাখা। মাথা ভর্তি ঝাঁকরা চুল। পরনে শতচ্ছিন্ন প্যান্ট, কোমরের সাথে দড়ি দিয়ে বাঁধা।
মদ্যপ মানুষটি বারবার তেড়ে যাচ্ছে একজন মহিলার দিকে। বোধহয় লোকটার স্ত্রী।
দেবা বলে উঠল, ‘সোশাল প্রবলেম’!
আমি মানসকে বললাম, ‘ক্যামেরার জুমটা বাড়া। জলসা বাকি আছে...’
এবার লোকটা ছুটে এল দেবা’র দিকে। শুরু হল অসংলগ্ন আত্মপ্রলাপ। আমরা এ হেন জলসা ক্যামেরাবন্দী করছি। লোকটা টলতে টলতে আমাদের কাছে উপস্থিত। আমরা প্রমাদ গুনলাম।
ধপ করে মাটিতে বসে বোকার মত হেসে ওঠে লোকটা। এরপর হাতজোড় করে কাঁদতে লাগল, ‘ হাসবেন না ছ্যার, বুকে নাগে’। কতকটা আত্মকথনের মত বিড়বিড় করছিল - ‘কত ছ্যার এল ... কিছু হবেক লাই’। এরপরের কথাগুলো আর বোঝা যায় না। হটাৎ চিৎকার করে উঠল-‘ ডাকুন পুলিসকে আমাদের ধরে লিয়ে যাক। খাওয়া লাই, আলো লাই, পয়সা লাই... পয়সা। ডাকুন পুলিসকে’।
তথাগত জবাব দেয়, ‘পয়সা না থাকলে পুলিস ধরে না, বদমায়েশি করলে ধরে’। কে শোনে কার কথা! লোকটি বিড়বিড় করে যাচ্ছে তখনও- ‘ডাকুন পুলিসকে...’
এরপর স্থানীয় কিছু যুবক লোকটিকে সরিয়ে নিয়ে যায়। আমাদের আশ্বস্ত করে বলে, ‘হারামি শালা ! কাজ বাজ নেই মাল খেয়ে খালি চিল্লাহল্লা করে’।
বিরকারের ঘরদোর
এর মাঝে পূর্ণাভ দা’র ফোন, ‘কোথায় তোরা? এ ডি স্যার ডাকছেন’।
ততক্ষণে সূর্যের তেজ অনেকটাই মরে এসেছে। বৃদ্ধ বটগাছ আরও শীতল ছায়া দিতে আরম্ভ করেছে। আমরা বিদিশার দিকে পা বাড়ালাম। পেছনে পড়ে রইল ‘বিরকার’ আর তার সীমাহীন দারিদ্র, মাটির ঘরের ভেতরের অমাবস্যা, ফসল কাটা মাঠ, হাড়িয়ার ঘ্রাণ, শক্ত মাঠের বুকের ফাটল, অশিক্ষার অভিশাপ আর হাড়িয়ার নেশায় বুঁদ মদ্যপের অসংলগ্ন আকুতি...
স্বাধীনতার পর ছয় দশকের বেশি সময় অতিক্রান্ত। তবু বিরকার পড়ে আছে মধ্যযুগীয় অন্ধকারে। অনাহার হয়ত নেই কিন্তু অপুষ্টি আছে। গভীর ভাবে মিশে আছে এদের শরীরে মনে। লিকলিকে হাত পা আর পেট মোটা শিশুর দল ঝাপসা চোখে চেয়ে থাকে। সুষম খাদ্যের হিসেব যেন ক্ষুন্নিবৃত্তির মিথ্যা মরীচিকা। প্রখ্যাত সাংবাদিক, গবেষক পি- সাইনাথ তাঁর ‘Everybody loves a good drought’ গ্রন্থের সূচনায় এই পরিস্থিতিকে ব্যখ্যা করেছেন সুনিপুণ ভাবে- ‘দিনে ২৪০০ কিম্বা ২১০০ ক্যালোরির আবশ্যিক খাদ্য পেয়েও দারিদ্র্যের তলানিতে থাকা যায়। সংকটদীর্ণ সোমালিয়া অথবা ইথিওপিয়ার চাইতে ভারতের সমস্যাটা সম্পূর্ণ ভিন্নতর। ক্ষুধা দারিদ্র্যের একটা দিক – এখানে তার চেহারাও অনেক বেশি জটিল।
বিদিশা আশ্রমের হরিণ
আরও নিচের স্তরে, প্রায় অদৃশ্য এবং তা সোমালিয়া এবং ইথিওপিয়ার মত টিভিতে প্রদর্শিত হয় না’। আরও গভীর প্রত্যয়ে লেখক বিশ্লেষণ করেন ‘অপুষ্টি’ আর ‘অনাহার’- এর যোগসূত্র- ‘ক্ষুধার কার্যকরণ অনেক কঠিন এবং গুরুত্বপূর্ণ, যারা অনাহারে থাকেনা তারাও অপুষ্টিতে ভোগে। শিশুরা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম. খাবার পায়। সর্বব্যাপী অভাবের প্রেক্ষাপটে সেটা আবার খুবই স্বাভাবিক বলে মনে হয়। কিন্তু পুষ্টির অভাব থেকে শারীরিক মানসিক বিকাশ রুদ্ধ হয়, তা থেকে প্রাণ সংশয়ও হতে পারে। গুরুতর রোগভোগের সময় কেউ যদি চিকিৎসার ন্যূনতম সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, তবে ক্ষুধার মতই তা প্রাণহানির কারণ হতে পারে’। সবশেষে সাইনাথ অস্বস্তিদায়ক প্রসঙ্গের অবতারণা করলেন, ‘কোটি কোটি গ্রামীণ দরিদ্র জনগণের স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার কি অধিকার আছে? অন্যান্য ভারতীয়দের মত একই অধিকার তারা ভোগ করে? শোষণের যে নির্মম প্রক্রিয়া দারিদ্র্যকে জন্ম দেয়, লালন করে, প্রায়শ, খুবই ভাসাভাসা ভাবে এই প্রক্রিয়াকে দেখা হয়’।
এগারোটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা রূপায়ন এবং বারো নম্বরের বাড়াবাড়ি রকমের আদিখ্যেতা’র সমান্তরালে বিরকারের মত গ্রামগুলি আজও বিদ্যুৎ ব্যবস্থারহিত, মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকের শেষ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। এ গ্রামের বেশিরভাগ শিশুরই এখন ‘প্রথম প্রজন্ম শিক্ষা’ ( First generation education) চলছে। চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীরা বাবা মায়ের নামটুকু বলতে পারে না, লেখা তো দূরের কথা!
আমরা যারা গাছের তলায় বসেছিলাম...
২০০৫ সালে বিশ্ব ব্যাংক জানিয়েছিল, ভারতের মোট জনসংখ্যার ৪১.৬% আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য সীমারেখার নীচে বাস করে ( অর্থাৎ ৪২ কোটির উপর ভারতীয় দিনে ১.২১ মার্কিন ডলার আয় করতে অক্ষম)। Oxford Poverty and Human Initiative- এর দেওয়া তথ্য আরও ভয়ানক। এদেশে আটটি এমন রাজ্য আছে, যাদের গরীব জনসংখ্যার সমষ্টি আফ্রিকা মহাদেশের ২৬ টি গরীবতম দেশের গরীব জনসমষ্টির থেকেও বেশি। অর্থাৎ সংখ্যাটা দাঁড়াচ্ছে ৩২ কোটিরও বেশি। UNICEF জানাচ্ছে, সারা বিশ্বের প্রতি তিনজন অপুষ্ট শিশুর একজন ভারতীয়। National Commission for Enterprises in the Unorganized Sector, 2007 – এর রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতবর্ষের মোট জনসংখ্যার ৭৭% (অর্থাৎ ৮৩.৬ কোটি) মানুষ বেঁচে থাকে ২০ টাকার কম প্রাত্যহিক খরচের উপর ভিত্তি করে। বিশ্বব্যাংক এর ভাষায়- ‘About 49 percent of world’s underweight children, 34% of the world’s stunted children and 49% of world’s wasted children, live in India’
কিন্তু পরিসংখ্যান বা ‘ডেটা’ কখনই দুঃখ কষ্টের পরিধিকে বিধৃত করে না, এ হেন সংখ্যার ভিড় বড়জোর দরজায় কড়া নাড়তে পারে। ঘরের ভেতরটাকে উপলব্ধি করতে হলে দরকার সহমর্মিতা। আবার দরজায় কড়া নাড়ার বিষয়টাও বিশুদ্ধ নয়। অনেক সময়ই ভুল দরজায় কড়া নাড়া হয়। বিগত দিনে মাঠে ঘাটে ‘ডেটার ডাটা চচ্চড়ি’ ব্যাপারটা প্রত্যক্ষ করেছি ভাল ভাবেই!!!!!!!!!!!!!!
পুনশ্চঃ জাতে মাতাল তালে ঠিক।

Wednesday, October 15, 2014

অবশেষে যেটা সিনেমা হতে পারেনি, কিন্তু জন্ম দিয়েছে রূপকথার

...'' ভেতরে ভেতরে একটা গোঙরানি মাঝেমাঝেই জাগে, সেটাকে চেপেচুপে বসে থাকতে হয়, নয়তো সামাজিক হওয়া যায় না। তবুও আমি মোহগ্রস্থের মত উলটোপালটা করি''। অনেকটা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের গদ্যের মত-‘ ওই ব্যাপারটা আমাকে ফুসলে নিয়ে যে কোনদিকে ভেগে পড়ে। তছনছ করে দেয়। বৈরাগীর ছাই মাখাতে থাকে দুহাতে-চার হাতে। আমি ওই উড়নচণ্ডীপনার সাথে এঁটে উঠি না’।
এই উড়নচণ্ডীপনার অঙ্গ হিসেবেই রূপকথার জন্ম। কোন এক শীতের ভোর। আমি আর কৈলাস পুরুলিয়া এক্সপ্রেস ধরতে ভোর সাড়ে চারটায় রওনা দিয়েছি। পুরুলিয়া স্টেশনে যখন পৌঁছেছি... তখন সাদা কুয়াশা আর হিম ঝরা কাঁপন লেগে ছিল আমাদের পুলওভারে। আদ্রা জংশন থেকে একটা গাড়ি ভাড়া করে পৌঁছুলাম কাশীপুর। আগের রাতেই পূর্ণাভ দা সব ব্যবস্থা করে রেখেছিল। DRCSC’র প্রশান্ত দা’কে ফোন করে জানা গেল... একটা বোলেরো পাঠাবে... কিন্তু কোথায় কি? গাড়ি এল অনেক পরে...
যখন আমরা ক্রোশঝুরি পৌঁছুলাম, তখন কুয়াশা কেটে গেছে। DRCSC’র সার্ভিস সেন্টারের নাম ‘ক্রোশঝুরি পলাশ’।এসময় নামকরণের সার্থকতা নির্ণয়ের মত সময় আমাদের হাতে ছিল না। মামুলকে সমস্ত বিষয়টা বোঝানোর পর ও ওর ‘কিশোর বাহিনী’কে রেফার করল। অতএব এবার গন্তব্য ‘দোলালাতা’ গ্রাম।
শাল মহুয়া ঘেরা ছবির মত সুন্দর সাঁওতালপল্লী এই দোলালাতা। অসহ্য বিমুঢ়তা সারা রাস্তা জুড়ে। লাল ধুলো উড়িয়ে গাড়ি ছুটে চলেছে... তার সাথে তাল মিলেয়ে ছুটছে এক দঙ্গল কচিকাঁচা। ক্যামেরা আর গাড়ি- ভিড় জমানোর পক্ষে যথেষ্ট। রেকি পর্ব সমাধা হতে হতে সাড়ে এগারোটা বাজল। তখনো আমরা অডিশন শুরু করতে পারিনি।এর উপর, মনমত একটা ছাগলের বাচ্চা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। বাবলু দা দায়িত্ব নিয়ে খুঁজে আনল সত্যিকারের তীর ধনুক।গোটা তিরিশেক বাচ্চার মধ্যে একজনকে বেশ মনে ধরল- শিবানী পরমাণিক।
কাজ শুরু করতে করতে বেলা সাড়ে বারোটা বেজে গেল। একটাই বাঁচোয়া -সমস্ত শট ডিভিশন ফ্রেম টু ফ্রেম আমি আগে থেকেই খাতায় ইলাস্ট্রেট করে রেখেছিলাম। কিন্তু ততক্ষণে বুঝে গেছি, এ কাজ শেষ হবে না।এর মাঝে টিফিন এল। আরও সময় নষ্ট। তবুও আজই সবটা নামাতে হবে। কেননা, ছবির মত সুন্দর চরাচর, কতগুলো বাচ্চার স্বপ্ন আর সিনেমা’র থেকে বড় কোন রোমান্স সেদিন ছিল না।
এক একটা শট নিতে হচ্ছিল কুড়ি-বাইশ বার। ছাগল ভেগে যায়... তাই মানব বন্ধনী বানানো হ’ল। এসবের পরও গল্পটা শেষ করতে পারলাম না। শেষ মোচড়টা বাদ গেল। বড্ড খারাপ লাগছিল। পরের দিন ছবি তোলা যেত, কিন্তু অফিস এত ছুটি দেবে কেন?
সন্ধ্যায় খেতে বসলাম। সারা গ্রামের লোক আমাদের সাহায্য করেছিল। পারিশ্রমিক দেবার সাধ্য নেই ... অতএব বনমুরগী জোগাড় করা হ’ল।
যেহেতু গল্পটা বদলে গেল... বলার অপেক্ষা রাখে না – সিনেমাটাও বদলে গেল। গল্পের শেষের সবটা হারিয়ে গেল। কিন্তু যেটা তৈরি হ’ল সেটা কি সিনেমা? আমার দেশ এখনো বিকল্প ভাবনার চলচ্চিত্রকে গ্রহণ করেনি। দুরন্ত স্টোরি টেলিংকে এখনো সিনেমার মান নির্ণায়ক ব্যারোমিটার বলে ধরে নেওয়া হয়। তাই ‘আর একটি রূপকথা’ কোন সিনেমা নয়। ছোট ছোট অনুভূতির মান্তাজ। অথচ আমার পুরনো চিত্রনাট্যে ‘সিনেমা’ হবার সব রসদ-ই ছিল। ছোট ছোট শট আর মান্তাজ মিলে যায় এখানে। কিন্তু কোন ডেফিনিট গল্প বলে না। ফলত দৈনন্দিন জীবনের একটা খাতা অথবা কয়েকটা পৃষ্ঠা তৈরি হয়।
কিন্তু এসবের পরেও রূপকথা তৈরি হয়েছে। শিবানী- সারা জীবনে ক্যামেরা দেখেনি। কোন ছবি নেই ওর ছেলেবেলার... তবুও যে মাপের অভিনয় ও করেছিল,সেটাকে স্বীকৃতি না জানিয়ে উপায় নেই... আর কোনদিন হয়ত কোন সিনেমায় ও আর অভিনয় করবে না। কিন্তু আমাকে আমার সিনেমা দর্শনের বাইরে একটা শিক্ষা দিয়ে গেল... প্রথাগত শিক্ষা জরুরী, কিন্তু প্রতিভা শুধু শহুরে বাবুদের ঘর আলো করে জন্মায় না। ওটা’র বীজ লুকিয়ে থাকে শেকড়ে।
কৈলাসকে যখন বলেছিলাম, কাজটা’র বারো বাজল। কৈলাস কোন উত্তর দেয় নি। সেদিন ২১ ইঞ্চির মনিটরে যখন শট সিলেকশন হচ্ছে, তখন মন জুড়ে শুধু দোলালতা, শিবানী আর আশ্চর্য সব স্মৃতিরা ভিড় করল-
শাল, ইউক্যালিপটাসের জঙ্গল, দিগন্ত বিস্তৃত লাল মাটির টাড়, শিবানী, কৈলাস, অজস্র বাচ্চা, সাঁওতাল পরিবার, বালিমাখা পোড়া সরাল, Panasonic AG-AC120 এ তুলে রাখা অপার্থিব সূর্যোদয়, একটা সিনেমা – সে এক তীব্র বনজ স্বাদ- গন্ধ যেন। এর সাথে কোথায় যেন মিশে যায় এই মহৎ শিল্পের প্রতি সততা। ‘জীবনে এর চেয়ে মূল্যবান কে বা কারা? সবার জন্য দুঃখ হচ্ছে আজ- সিনেমার এই উড়নচণ্ডীপনাকে যারা ধরতে পারল না, তাদের সবার জন্য। একটা সিনেমা যেন সিনেমা হয়ে উঠতে পারল না... এই দুঃখের থেকে বড় সুখ- আর একটি রূপকথা’র জন্ম দেখলাম। এডিটিং-এ বসে এক বছর আগে এসবই ভাবছিলাম---- ‘বাঁচার কি সুখ!...’
পুনশ্চঃ কার্তিক অনেক দিন ধরেই বলছিল—একটা সিনেমাও ইউটিউবে ছাড়ছ না কেন? বোঝানো মুশকিল, তাহলে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালগুলো ঝামেলা করে। কার্তিকই খড়গপুর আই আই টি’ তে বসে এই রদ্দি মার্কা প্রিন্টটা আপলোড করল (অবশ্য ওকে ওটাই দিয়েছিলাম)। ধন্যবাদ কার্তিক।
সবশেষে আর একটা কথা... আমার সহযাত্রী এবং পরিচালক শশী সরকার আমায় বলেছিল কয়েকটা ছবি আপলোড করতে... করলাম। সাথে লিঙ্কটাও শেয়ার করছি। আশাকরি অনুভব করবে---

* ''- শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বিভিন্ন লেখা থেকে ধার করা। 

ডাটা চচ্চড়ি

 ডাটাচচ্চড়ি  
০১০-এর মার্চ মাস নাগাদ একটা প্রোজেক্টের ‘ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট’-এর জন্য দেওঘর গিয়েছিলাম। … নাবার্ড ফান্ডেড একটা ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট।’। কথাটা বলে টুনুদা একমনে সিগারেটের ধোঁয়া দিয়ে রিং তৈরি করছেন।
প্যাকাই মুখ খুলল, ‘কিসের প্রজেক্ট?’
- শ্রী পদ্ধতিতে ধান চাষ।
- অ্যাঁ! কি পদ্ধতি? স্ত্রী পদ্ধতি? ... বুঝেছি, বাড়ির মেয়েরা চাষ করে।
- তুই একটা রামছাগল। ‘শ্রী’ মানে SRI, System of Rice Intensification… তবে এখন System of Root Intensificationও বলা হয়। উইকিপিডিয়ায় দেখে নিস। যাই হোক ...
- আর একসেট চা আর কুত্তা খাওয়া কটকটি বিস্কুট অর্ডার করি?
- করে দে...
টুনুদা একটা হাই তুললেন। এবার গল্প শুরু।
‘ সারওয়াহ ব্লকের আটটি গ্রামে এই প্রোজেক্ট চলছিল। ইমপ্যাক্ট অ্যানালিসিসের জন্য আমার দরকার ছিল বেসলাইন সার্ভে রিপোর্ট। অনেকবার চাইবার পর ওটা হাতে এল। ফাইনাল সার্ভের কাজ শুরু করতে গিয়ে দেখি বিস্তর গোলমাল। শুধু জমি বা ফসলের পরিমাণ নয়, স্টেকহোল্ডারদের বয়সেও জল মেশানো হয়েছে।‘
টুনুদা রীতিমত উত্তেজিত হয়ে বলে চলেছেন, ‘ তোরা তো জানিস, আমি এসব বরদাস্ত করতে পারিনা। অতএব ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্ণধারকে বিষয়টা জানালাম। ... ইনি আবার এক কাঠি ওপরে। বললেন- সবকিছু ঠিকঠাক আছে। জীবন বদলে দেওয়ার গল্প চাই-‘।

টুনুদা বিপ্লবী কাটিং মুখ করে বলা শুরু করলেন,’তাহলেই ভাব, ডেটা নিয়ে আমরা এত কচকচি করি... আর ওগুলো ঘরে বসে বসে তৈরি করা হয়’।
এমন সময় টুনুদা’র রাঁধুনি বেহারিলাল উপস্থিত। প্রায় প্রত্যেকদিন টুনুদাকে সুমনের দোকান থেকে ডেকে নিয়ে যায়। এটাকে বেহারিলাল ওর কাজের অঙ্গ হিসেবেই ধরে নিয়েছে।
- খানা লাগা দিয়া বাবু
- কেয়া হ্যায় খানে মে?
- আজ আপকা পসন্দিদার খানা পকায়া... ‘ডেটা চচ্চড়ি’
- আব্বে বেওকুফ! ‘ডেটা চচ্চড়ি’ নয়, ওটা ‘ডাটা চচ্চড়ি’!!!!!!!!

বিঃদ্রঃ ২০০৫ সালে বিশ্ব ব্যাংক জানিয়েছিল, ভারতের মোট জনসংখ্যার ৪১.৬% আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য সীমারেখার নীচে বাস করে ( অর্থাৎ ৪২ কোটির উপর ভারতীয় দিনে ১.২১ মার্কিন ডলার আয় করতে অক্ষম)। Oxford Poverty and Human Initiative- এর দেওয়া তথ্য আরও ভয়ানক। এদেশে আটটি এমন রাজ্য আছে, যাদের গরীব জনসংখ্যার সমষ্টি আফ্রিকা মহাদেশের ২৬ টি গরীবতম দেশের গরীব জনসমষ্টির থেকেও বেশি। অর্থাৎ সংখ্যাটা দাঁড়াচ্ছে ৩২ কোটিরও বেশি। UNICEF জানাচ্ছে, সারা বিশ্বের প্রতি তিনজন অপুষ্ট শিশুর একজন ভারতীয়। National Commission for Enterprises in the Unorganized Sector, 2007 – এর রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতবর্ষের মোট জনসংখ্যার ৭৭% (অর্থাৎ ৮৩.৬ কোটি) মানুষ বেঁচে থাকে ২০ টাকার কম প্রাত্যহিক খরচের উপর ভিত্তি করে। বিশ্বব্যাংক এর ভাষায়- ‘About 49 percent of world’s underweight children, 34% of the world’s stunted children and 49% of world’s wasted children, live in India’

For more info 

এভিয়ান হারাকিরিঃ কয়েকটি পাখির আত্মহনন বৃত্তান্ত


এভিয়ান হারাকিরিঃ কয়েকটি পাখির আত্মহনন বৃত্তান্ত   

 ছবিটি আঁকা হয়েছে অ্যাক্রেলিক রঙে
অলংকরণ- শ্রী শাম্ব

জাটিঙ্গা গ্রামে পৌঁছুলাম বিকেল চারটে নাগাদ। বর্ষা শেষে এদিকের জঙ্গল-পাহাড় টকটকে সবুজ। নাকে ভেসে আসছে তীব্র বনজ গন্ধ। একটা সরু হাওয়ার প্রলেপ লেগে গেল পুলওভারে। এখন সেপ্টেম্বরের শেষ। এদিকটায় সবে ঠাণ্ডা পড়েছে।
এই গ্রামটার কথা প্রথম শুনেছিলাম অমলকান্তির কাছে। অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি, কিন্তু ছুঁয়ে গেছে রোদ্দুরের পৃথিবী, ঘামের পৃথিবী, রাতের পৃথিবী, দিনের পৃথিবী, মাটির পৃথিবীকে। ঘুরে বেড়িয়েছে ভারতবর্ষের এ গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে। ওর সাথে আমার আলাপ হয়েছিল রাজস্থানের রামদেওড়াতে। স্টেশনের বাইরে কয়েকটা পাখির মৃত দেহ দেখে বলেছিল, ‘এভিয়ান হারাকিরি
-
মানে?
-
অবিকল একই ঘটনা। আত্মহনন।
পাখিগুলো আগুনে ঝলসে গেছে। পাশেই ধিকিধিকি আগুন এখনও জ্বলছে। কয়েকটা ডালপালা জড়ো করে কে বা কারা যেন আগুন তাপিয়েছে। কিন্তু পাখিরা কি আত্মহত্যা করে? প্রেইং মেন্টিস আর কিছু

পোকামাকড় মিলনের সময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে- এটা শুনেছি। এক্কেবারে অন্য বিষয়। মানুষ ছাড়া এভাবে আর কোন প্রাণী ভাবতে পারে বলে মনে হয়না। আত্মহত্যার জন্যও তো কিছু ভাবনা জরুরী। মানুষ ছাড়া আর কোন প্রাণী আত্মহত্যা করে বলে তো জানা নেই।
-
অবশ্যই করে। জাটিঙ্গা গ্রামে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত পাখিরা আত্মহত্যা করে। যখন আকাশে চাঁদ থাকেনা...
-
জাটিঙ্গা গ্রাম?
-
হুম। অসমের ডিমা হাসও জেলার একটা ছোট্ট গ্রাম...। আমি নিজে চোখে দেখেছি। বক, লিটল এগ্রেট, হ্যারন, পিট্টা, মাছরাঙ্গাআরও অনেক পাখি। সেলিম আলিও দেখেছিলেন।
সেলিম আলির নাম আমি আগে শুনেছি। বিখ্যাত পক্ষী বিশারদ।

এরপর অমলকান্তির মুখে শুনেছিলামঃ এই অদ্ভুত ঘটনা ঘটে কুয়াশা ঢাকা রাতে- যে রাতে চাঁদ ওঠেনা । প্রচণ্ড শীত থেকে বাঁচার জন্য মানুষ আগুন জ্বালায়। আর ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি এসে এই আগুনে জ্বলে পুড়ে মরে। অথচ এটা অস্বাভাবিক। এরা কেউ রাত জাগা পাখি নয়। ওরনিথোলজিস্টরা বলেছেন, এসময় এই এলাকায় আবহাওয়া এবং ভূগর্ভস্থ জলে পরিবর্তন আসে, হয়ত এই পরিবর্তন পাখিদের কাম্য নয়। আতঙ্কিত হয়ে এরপর আত্মহত্যা করে। কিন্তু এ ব্যখ্যা সম্পর্কে তাঁরাও সন্দিহান। সেলিম আলি এর জন্য দায়ী করেছেনউচ্চতা, কুয়াশা আর ট্রমা’ –এসব ফ্যাক্টরকে।
অমলকান্তি এসব বিশ্বাস করেনা। ওর ধারণা, গোটা ব্যাপারটাই মনস্তাত্ত্বিক। আসলে মানুষের মত পাখিদেরও চাওয়া পাওয়া আছে। প্রথম যে পাখিটি আত্মহত্যা করেছিল, সে মৃত্যুর আগে আত্মহত্যার কারণ জানিয়ে গিয়েছিল আরেকজনকে। এভাবে বিষয়টা অন্যদের কানে পৌঁছনোর পর অনেকেই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। সব পাপ ধুয়ে ফেলতে চায়। এরপর ব্যাপারটা গণহিস্টিরিয়ার আকার নেয়। সেটা ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ। সেবারই প্রথম আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছিল। ওদের অজান্তেই একশ বছর ধরে এই ঘটনা চলতে থাকে। এখন বোধহয় এটা একটা ট্র্যাডিশন ওদের কাছে... ।
এসব সাতপাঁচ ভাবছিলাম।
এখানে সন্ধ্যা নামে ঝুপ করে। আকাশের জুড়ে কে যেন কুহেলী হিমানীর কাফন বিছিয়েছে। ধোঁয়া ধোঁয়া কুয়াশার গন্ধ নাকেমুখে লেগে আছে। এই দমবন্ধ কুয়াশার রাতে মৃদু ফিসফাস শোনা যায়।
একটা ধোঁয়ার রেখা দেখা যাচ্ছে । এটা কুয়াশা নয়। কারা যেন আগুন জ্বেলেছে। একটা মৃদু শব্দ শুনতে পাচ্ছি, ডানা ঝাপটানোর। আমার চোখের পাতায় ঘন কুয়াশা জমেছে বোধহয়। আমি তাকিয়ে থাকতে পারছি না। ক্রমশ চোখ মুদে আসছে। বেসুরো ডানা ঝাপটানোর শব্দ এখন কুয়াশার থেকেও ঘন। এবার সব পাপ আগুনে ধুয়ে মুছে সাফ হবে। জিব্রাইলের আগুনের পাখার উত্তাপ তিনি টের পাননি কোনদিন। আমি বেশ টের পাচ্ছি। হিস্টিরিয়া আক্রান্ত আমি এগিয়ে চলেছি আগুনের দিকে। বেশ টের পাচ্ছি...